ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন গাজা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের নানা রাজধানীতে এখন ব্যস্ত কূটনীতি চলছে। উপসাগরীয় দেশ থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্র প্রকাশ্যে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের সমর্থন নিঃশর্ত নয়—শর্তসাপেক্ষ, সতর্ক এবং মূলত নির্ভর করছে হামাস ও ইসরায়েলের আচরণের উপর।
মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান
কাতার, মিশর ও তুরস্ক—এই তিন দেশ হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছে। তারা গোষ্ঠীটিকে পরিকল্পনাটির প্রতি ইতিবাচক জবাব দিতে আহ্বান জানিয়েছে। দোহায় বৈঠকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “এটাই যুদ্ধ থামানোর সর্বোত্তম সুযোগ,” তবে তিনি যোগ করেছেন পরিকল্পনার কিছু অংশ এখনও পরিষ্কার করা দরকার।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), জর্ডান, মিশর, তুরস্ক, কাতার, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের “সদিচ্ছা প্রচেষ্টা”কে স্বাগত জানিয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, সহায়তা অবাধ প্রবাহ, কোনো রকম জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ না হওয়া, ইসরায়েলের পূর্ণ প্রত্যাহার এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।
ইউএই ও সৌদি আরবের সতর্ক বার্তা
ইউএই ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছে যে, যদি পশ্চিম তীরের ভূমি দখল বা সংযুক্তির চেষ্টা হয়, তবে আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়বে।
সৌদি আরবও জানিয়ে দিয়েছে তারা সহযোগিতায় প্রস্তুত, তবে শর্ত হলো মানবিক সহায়তা, বন্দি বিনিময় এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিশ্চিত করতে হবে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) পরিকল্পনাটিকে সমর্থন জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, শাসন সংস্কার ও নতুন নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গাজায় প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি আছে। এ অবস্থান হামাসের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যে তারা গাজায় কেবল সামরিক শক্তি হিসেবে নয়, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে রাজি হবে কিনা।
হামাসের জবাবের অপেক্ষা
সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হামাস। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, “তিন-চার দিনের মধ্যে” জবাব দিতে হবে। মধ্যস্থতাকারীরা ধারণা করছেন, হামাস শর্তযুক্ত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
কিন্তু তাদের প্রধান আপত্তি—অস্ত্র সমর্পণ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মেনে নেওয়া এবং গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার বিষয়গুলো। এর বিনিময়ে প্রস্তাবিত হচ্ছে ব্যাপক বন্দি বিনিময়, ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তা।
ইসরায়েলের দ্বিধা
নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে পরিকল্পনাটিকে সমর্থন করলেও তার জোটের ভেতরে বিরোধ তীব্র। বন্দিদের পরিবার ও সেনা কর্মকর্তারা সমঝোতার পক্ষে, কিন্তু কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা যেকোনো প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করছেন যা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় আরব দেশগুলোর শর্ত—বিশেষত পশ্চিম তীর দখল বন্ধ রাখা—নেতানিয়াহুর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
সমর্থন বাস্তবায়ন না কেবল বক্তব্য?
বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন এখনো মূলত রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কেউই এখনো শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য সেনা পাঠানোর বা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, “এটা এখনো রাজনৈতিক কভার, বাস্তব অঙ্গীকার নয়।”
সামনে কী?
হামাস যদি অন্তত শর্তযুক্ত ইতিবাচক জবাব দেয়, তবে আলোচনার পরবর্তী ধাপ হবে বন্দি ও জিম্মি বিনিময়, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি, আন্তর্জাতিক বাহিনীর কার্যপদ্ধতি এবং গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন।
সৌদি আরব ও ইউএই যদি অর্থায়ন ও লজিস্টিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং কাতার, মিশর, তুরস্ক যদি হামাসকে চাপ অব্যাহত রাখে, তবে পরিকল্পনা এগোতে পারে। অন্যথায় এটি আরেকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা হয়ে থাকবে।
মোটকথা মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তাদের অবস্থান সতর্ক ও শর্তসাপেক্ষ। পরবর্তী কয়েক দিনেই বোঝা যাবে হামাস ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া এই কূটনৈতিক সমীকরণকে শান্তির পথে নিয়ে যাবে, নাকি অচলাবস্থায় ফেলে রাখবে।

