দুবাইয়ে এশিয়া কাপ ২০২৫-এর ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিল। রোববার পাঁচ উইকেটে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করলেও ভারতীয় দল ট্রফি গ্রহণ না করে অভূতপূর্ব এক ঘটনার জন্ম দিয়েছে।
ট্রফি বয়কটের বিতর্ক
ফাইনালে জয়ের পর ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ও তার সতীর্থরা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এএসসি)-এর সভাপতি এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভীর কাছ থেকে শিরোপা নিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তারা মাঠেই কাল্পনিক ট্রফি উঁচিয়ে ধরে উৎসব শুরু করেন।
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সূর্যকুমার বলেন,
“আমি ক্রিকেট খেলা শুরু করার পর থেকে এমন ঘটনা কখনও দেখিনি—চ্যাম্পিয়ন দলকে ট্রফি দেওয়া হচ্ছে না। আমরা মাঠেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এই ট্রফি নেব না। আমার কাছে আসল ট্রফি হলো ১৪ জন খেলোয়াড় ও পুরো সাপোর্ট স্টাফ।”
পুরো উপস্থাপনা অনুষ্ঠান প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। পরে ধারাভাষ্যকার সাইমন ডুল ঘোষণা করেন—“ভারতীয় দল আজ কোনো পুরস্কার নেবে না, এএসসি আমাকে এমনটাই জানিয়েছে।” এতে ম্যাচ-পরবর্তী আয়োজন একপ্রকার ভেস্তে যায়।
পাকিস্তান অধিনায়কের ক্ষোভ
ভারতের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পাকিস্তানের অধিনায়ক সালমান আগা। তিনি বলেন,
“যদি তারা আমাদের সঙ্গে হাত মেলাতে না চেয়ে আমাদের অসম্মান করে থাকে, তাহলে তারা ক্রিকেটকেই অসম্মান করেছে। ভালো দল এমন কাজ করে না। আমরা ধৈর্য ধরে মেডেল নিয়েছি। কিন্তু তারা যা করেছে, তা ক্রিকেটের জন্য খারাপ বার্তা।”
এটি ছিল টানা তৃতীয় ম্যাচ যেখানে দুই দলের ক্রিকেটাররা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়।
মাঠের ভেতরে প্রতীকী ইঙ্গিত
ফাইনালে উত্তেজনা ছড়ায় আরও কিছু ঘটনাতেও। ভারতের জসপ্রীত বুমরাহ পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান হ্যারিস রউফকে আউট করার পর ‘ক্রাশিং-প্লেন’ ভঙ্গিতে উদযাপন করেন।
এর আগে রউফও একই ভঙ্গি করেছিলেন, যা ভারতের সামরিক অভিযানের প্রতি বিদ্রূপ হিসেবেই দেখা হয়েছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানি ওপেনার সাহিবজাদা ফারহান হাফ-সেঞ্চুরি করার পর বন্দুক চালানোর ভঙ্গি করে বিতর্কে জড়ান।
সীমান্ত সংঘাতের ছায়া
গত মে মাসের চার দিনের সামরিক সংঘাতের পর এশিয়া কাপ ছিল ভারত-পাকিস্তানের প্রথম মুখোমুখি লড়াই। সেই সংঘাতে উভয় পক্ষেই ৭০ জনের বেশি নিহত হয়। ভারত তার সামরিক অভিযানকে নাম দিয়েছিল “অপারেশন সিন্দুর”—যা প্রতিশোধ ও শহীদ নারীদের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
ভারতের জয়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি এক্সে লেখেন, “#OperationSindoor মাঠেও একই ফল—ভারত জয়ী! অভিনন্দন আমাদের ক্রিকেটারদের।”
জবাবে এএসসি সভাপতি মোহসিন নকভী কড়া প্রতিক্রিয়া দেন:
“যদি যুদ্ধই আপনাদের গর্বের মাপকাঠি হয়, তবে ইতিহাসে পাকিস্তানের কাছে আপনাদের লজ্জাজনক পরাজয় আগেই লিপিবদ্ধ আছে।”
ক্রিকেট নাকি কূটনীতি?
ভারত ও পাকিস্তান এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলছে না। কেবল বিশ্ব আসর বা নিরপেক্ষ ভেন্যুতেই মুখোমুখি হচ্ছে। এ কারণেই প্রতিটি ম্যাচ হয়ে উঠছে রাজনৈতিক বার্তার ক্ষেত্র।
এশিয়া কাপের ফাইনাল তাই শুধু ক্রিকেটীয় সাফল্যের গল্প নয়, বরং সীমান্তের উত্তেজনা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল। ট্রফি বয়কট, প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি আর রাজনৈতিক নেতাদের টুইট—সব মিলিয়ে ক্রিকেট আবারও রূপ নিল এক অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্রে।

