কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বাংলাদেশে দুর্গাপূজা শুরু

৩৩ হাজারের বেশি মণ্ডপে উৎসব, তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগ

বাংলাদেশজুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মন্দিরে হামলার খবরের মধ্যেই শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের এই উৎসব।

রবিবার ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্যে মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার মুখ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

কড়া নিরাপত্তা

সরকারি হিসাবে এবছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে—গত বছরের তুলনায় প্রায় ১,৯০০ বেশি। নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে দুই লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, যার মধ্যে পুলিশ, আনসার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‍্যাব ও সেনা সদস্যও রয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো ধরনের গুজব বা ভুল তথ্য দিয়ে কেউ যাতে অশান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে।” তিনি গণমাধ্যমকেও গুজব প্রতিহত করার আহ্বান জানান।

আয়োজন ও আশঙ্কা

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, এ বছর পূজার আয়োজন বেড়েছে। তিনি বলেন, “আমরা আশা করি এ বছর উৎসব আনন্দমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে। সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট।”

তবে তিনি জানান, অন্তত ১১টি জেলায় “কিছু বিঘ্ন” সৃষ্টি হয়েছিল, যা দ্রুত সমাধান করা হয়েছে এবং দোষীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব বলেন, “প্রতিবছরই হামলার ঘটনা ঘটে। শুধু পাঁচ দিনের পূজার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই হবে না। প্রকৃত অর্থে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাইলে ৩৬৫ দিনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ

গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, “বাংলাদেশ এক পরিবার।” কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংখ্যালঘুরা অভিযোগ করছে, তাদেরকে জাতীয় ঐক্য কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৩০ দিনে সংখ্যালঘুদের ওপর ২,৪৪২টি সহিংস ঘটনার অভিযোগ এসেছে—যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, মন্দির ভাঙচুর, জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও ছোট সম্প্রদায়ের ওপর হামলা অন্তর্ভুক্ত।

ভারতও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

শুভেচ্ছা বার্তা

ভারতে নির্বাসিত অবস্থান থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “অতীতেও যেমন উগ্রবাদী শক্তি ব্যর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতেও তারা সফল হবে না।”

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসও শুভেচ্ছা বার্তা দেন। তিনি বলেন, “দুর্গাপূজার মূল বার্তা হলো অসুর বিনাশ, সত্য ও সৌন্দর্যের বিজয়।”

সামনে পথ

দেশের নানা প্রান্তে মণ্ডপগুলোতে নতুন পোশাকে সজ্জিত ভক্তরা ভিড় জমিয়েছেন। দেবী বিসর্জন হবে ২ অক্টোবর। সরকার আশ্বাস দিয়েছে—“সব ধরনের ব্যবস্থা” নেওয়া হয়েছে যেন শান্তিপূর্ণভাবে পূজা সম্পন্ন হয়।

তবে সম্প্রদায়ের নেতারা সতর্ক করেছেন, অতীত হামলার বিচার না হলে “ভয়ের চক্র ভাঙবে না।”

spot_img