জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা এক দশক পর আবারও ইরানের ওপর ফিরিয়ে এনেছে ইউরোপের তিন প্রভাবশালী দেশ—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি।
শনিবার রাত ১২টা (জিএমটি) থেকে কার্যকর হওয়া এই নিষেধাজ্ঞাকে তারা বলছে “শেষ উপায়”। যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো জানিয়েছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দেওয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে না।
তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একযোগে বলেন, “আমরা ইরানকে আহ্বান জানাই যেন তারা আর কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না করে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল মানে কূটনীতির শেষ নয়।”
নিষেধাজ্ঞার পটভূমি
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)-এর মাধ্যমে ইরানের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
এরপর থেকে ইরান উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে বাধা দিতে শুরু করে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের দাবি, নানা পর্যায়ের আলোচনা সত্ত্বেও তেহরান স্বচ্ছতা দেখায়নি।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান নিষেধাজ্ঞাকে “অন্যায়, অবিচার ও বেআইনি” আখ্যা দিয়েছেন। শুক্রবার তেহরানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে তিনি সতর্ক করেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সহযোগিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে তিন মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরানের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, “প্রতি মাসে নিজেদের গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে রাখব কেন?”
শনিবার ইরান ঘোষণা করেছে, তারা লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিন থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে পরামর্শের জন্য তেহরানে ফিরিয়ে নিচ্ছে।
ইউরোপীয় অবস্থান
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি বা ই–থ্রি (E3) জানিয়েছে, তারা দীর্ঘ আলোচনার পরেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়া চালু করেছে। এতে আগের সব জাতিসংঘ প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে গেছে।
তারা বলেছে, “ইরান আমাদের উদ্বেগ দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি, আইএইএ পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার দেয়নি এবং উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুতের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও দেয়নি।”
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তবে একই সঙ্গে ইউরোপ জানিয়েছে, তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখবে।
ইরানও ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় তবে তারা আলোচনায় ফিরতে পারে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সম্প্রতি হুমকি প্রত্যাহার করেছেন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাবে।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসায় ইরান ও পশ্চিমা শক্তির সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে ইউরোপ বলছে, ইরান প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় এ সিদ্ধান্ত অনিবার্য; অন্যদিকে তেহরান একে বেআইনি ঘোষণা করে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

