খাগড়াছড়ি–রাঙামাটির সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এক বছর: বিচারহীনতায় ক্ষোভ

চার পাহাড়ি নিহতের পরিবার ও অধিকারকর্মীদের দাবি—দোষীদের শাস্তি, ক্ষতিপূরণ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে গত বছরের ১৯–২০ সেপ্টেম্বর সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহত চারজনের পরিবারের প্রতি ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় সংখ্যালঘু অধিকার কর্মীরা। এক বছর পার হলেও বিচার না হওয়ায় তারা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ঢাকায় মশাল মিছিল ও সমাবেশ

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর রাজু ভাস্কর্যের সামনে “সম্মিলিত পাহাড়ি ছাত্র-জনতা” ব্যানারে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে তারা মশাল মিছিল করে নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন। বক্তারা বলেন, চারজন মানুষকে হত্যার পরও রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় দোষীরা এখনও বিচারের বাইরে। তারা অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

নিহতদের স্মরণ

২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির দিঘীনালায় ধনঞ্জয় চাকমা (৬০) নিহত হন। একই দিনে শহরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন জুনান চাকমা (২০) ও রুবেল ত্রিপুরা (৩০)। পরদিন ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটির কুতুকছড়িতে নিহত হন আনিক চাকমা (২০)। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, তিনজনকে হত্যা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর আনিককে হত্যা করে বাঙালি বসতিস্থাপনকারীরা।

খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতেও একই দিন শোকসভা ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। খাগড়াছড়ি শহরে নিহতদের পরিবার স্মরণসভা আয়োজন করে। সেখানে রুবেল ত্রিপুরার মা নিরন্তা দেবী ত্রিপুরা এবং জুনান চাকমার মা রূপশা চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক বছর কেটে গেল, কিন্তু কোনো বিচার পেলাম না।”

সহিংসতার সূত্রপাত

প্রেক্ষাপট শুরু হয় ১৮ সেপ্টেম্বর, যখন মোহাম্মদ মামুন নামে এক বাঙালির মরদেহ উদ্ধার হয়। মামুনের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা ছিল এবং তিনি গণপিটুনিতে নিহত হন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এর প্রতিবাদে ১৯ সেপ্টেম্বর হাজারো বাঙালি দিঘীনালায় মিছিল বের করে এবং সংখ্যালঘু পাহাড়িদের ওপর হামলা চালায়। এতে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, শত শত পরিবার নিরাপত্তার জন্য পালিয়ে যায়।

পরের দিন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে রাঙামাটিতেও। এভাবেই দুই জেলায় রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে, যার অভিঘাত এখনও বহন করছে পাহাড়ের মানুষ।

নতুন করে ন্যায়বিচারের দাবি

রাঙামাটির কুতুকছড়িতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও হিল উইমেনস ফেডারেশন—এই তিনটি সংগঠন সমাবেশ করে। বক্তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু থাকলে এই সহিংসতা বারবার ঘটতে থাকবে।

অধিকার কর্মীদের ভাষায়, এই হত্যাকাণ্ড শুধু কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে পাহাড়ে সহিংসতার দুষ্টচক্র চলতেই থাকবে।

শোকাহত পরিবারগুলোর কাছে আজও সবচেয়ে বড় বেদনা হলো—প্রিয়জনকে হারানোর এক বছর পরও বিচার শুরু হয়নি। জুনান চাকমার মা রূপশা চাকমা বলেন, “স্মৃতি আছে, কষ্ট আছে, কিন্তু ন্যায়বিচার নেই। এই শূন্যতা আরও বড়।”

spot_img