বাংলাদেশে সুফি মাজারে হামলার ঢেউ, সরকারের নীরবতায় উদ্বেগ

জিসিডিজি’র প্রতিবেদন বলছে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের পাশাপাশি সুফি মাজার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতেও হামলা বাড়ছে, অথচ সরকার কার্যত নীরব।

কানাডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স (জিসিডিজি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরকার সুফি ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিও আজ চরমভাবে আক্রমণের মুখে।

‘দ্য বার্নিং অব শ্রাইনস: বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আত্মা আক্রমণের মুখে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, হিন্দু, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতার শিকার হলেও গত বছরের আগস্ট থেকে টানা শতাধিক সুফি মাজার, দরগাহ ও তীর্থস্থানকে পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অনেক ক্ষেত্রেই দিনের আলোয়, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। অথচ কার্যত কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি।

সাংস্কৃতিক আত্মাকে মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা

জিসিডিজি বলছে, সুফি মাজারগুলো শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়; বরং শত শত বছর ধরে এগুলো বাংলার সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ শান্তি, আরোগ্য ও বরকতের খোঁজে সমবেত হয়। এই ঐতিহ্যের ওপর হামলা মূলত বাংলাদেশের বহুত্ববাদী আত্মাকে নিশ্চিহ্ন করার একটি প্রচেষ্টা।

তাদের ভাষায়: “এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক হামলার অংশ। এর লক্ষ্য হলো বহুমুখী ও সহনশীল ধর্মীয় সংস্কৃতিকে মুছে দিয়ে সংকীর্ণ ও আমদানি করা এক উগ্র মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া।”

সরকারের নীরবতায় ক্ষোভ

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা। প্রতিবেদনে বলা হয়, “রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তহীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা উগ্রবাদীদের আরও উৎসাহিত করছে। ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে-আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।”

জিসিডিজি সতর্ক করেছে, যদি অবিলম্বে শক্ত অবস্থান নেওয়া না হয়, তবে বাংলাদেশ তালেবান ঘরানার উগ্রপন্থার উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

অস্তিত্ব সংকটের হুঁশিয়ারি

বাংলাদেশ যে বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তারা বলছে, “এটা শুধু ধর্মীয় সহিংসতা নয়, বরং দেশের আত্মার ওপর আঘাত। নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আধ্যাত্মিক নেতাদের একসাথে দাঁড়াতে হবে। নাহলে ক্ষতিটা হবে অপূরণীয়।”

বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, মাজার ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা মানে কেবল একটি সম্প্রদায়কে আঘাত করা নয়, বরং গোটা জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করা। এই ধারা চলতে থাকলে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চেতনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

spot_img