স্কুলশিক্ষিকা তাসমিন আরা নাজ গত মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পরেই তাঁর (৪৩) নিথর দেহ ভেসে ওঠে ঘাঘটের পানিতে (jagonews24.com)। একই দিন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় দুই দিন ধরে নিখোঁজ মসজিদের ইমাম রফিকুল ইসলামের (৩৮) মরদেহটি স্থানীয় ক্ষিরাই নদীতে ভেসে থাকতে দেখে সবাই হতবাক।
ইমামের আকস্মিক এই পরিণতিতে মসজিদ কমিটির সভাপতি বিল্লাল উদ্দিন বলেন, “আজ সকালে তার মরদেহ নদীতে ভাসতে দেখি। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক।” (ittefaq.com.bd)। শান্ত নদীগুলোতে এভাবে চেনা মানুষের লাশ ভেসে ওঠা গ্রামেগঞ্জে গভীর শোক ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের টার্গেট করে হামলা ও হত্যার ঘটনা অহরহ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে, যার অনেকগুলোই ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে।
একের পর এক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার
আলোচিত এসব ঘটনা শুধু দুই-একটি নয়। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নদনদী থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবর মিলেছে। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজীবাছা নদীতে ১ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তির লাশ দেখা যায় (ittefaq.com.bd)। আবার ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে বাঁকখালী নদীতে বালু উত্তোলনের ড্রেজারের রশিতে আটকে থাকা এক তরুণীর মরদেহ দেখতে পায় লোকজন (dailykaratoa.com)।
পুলিশ এসে অজ্ঞাত সেই নারীর (বয়স আনুমানিক ২২) লাশ উদ্ধার করে। তবে শরীর ফুলে যাওয়ায় মেয়েটিকে চিনতে পারেনি কেউ। এমন অজানা পরিচয়ের মরদেহের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ পরীক্ষার মতো প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ (ittefaq.com.bd)।
আড়াই সপ্তাহে নদী থেকে এক ডজন মরদেহ উদ্ধার
সেপ্টেম্বরের প্রথম আড়াই সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশের নদী-নালা থেকে কমপক্ষে এক ডজন মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এদের মধ্যে কারও পরিচয় মিলেছে, কারও এখনো মেলেনি। ময়নাতদন্তের আগ পর্যন্ত অনেক ঘটনাতেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে আগস্টের শেষে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে যে যুবকের ক্ষতবিক্ষত মস্তকবিহীন মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল, সেটিকে স্পষ্টতই একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড বলে শনাক্ত করে পুলিশ (ittefaq.com.bd)। ওই ভিকটিমের দেহে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল এবং মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
আট মাসে ২,৬১৬টি হত্যা; ১৭ দিনে শতাধিক
নদীতে মরদেহ উদ্ধারের বাইরে বৃহত্তর চিত্রটিও কম ভয়াবহ নয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনে বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে অগণিত। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশজুড়ে ২,৬১৬টি খুনের মামলা দায়ের হয়েছে (tbsnews.net)।
গড়ে মাসে ৩২০টির বেশি হত্যাকাণ্ড, অর্থাৎ দিনে প্রায় ১০-১২টি করে খুনের ঘটনা! এই হারে হিসাব করলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে প্রায় দেড় শতাধিক প্রাণহত্যার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম প্রতিদিনই এমন নৃশংস ঘটনার খবর দিচ্ছে।
কোথাও পারিবারিক কলহে একই পরিবারের দুইজন খুন হচ্ছেন, আবার কোথাও সামান্য বিরোধে রাস্তায় প্রকাশ্যে ঘটে যাচ্ছে প্রাণসংহার। বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রবাসী ইদ্রিস আলীর বাড়িতে ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে তার স্ত্রী রানী বেগম (৪০) ও কলেজপড়ুয়া ছেলে ইমরানকে (১৮) রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত পাওয়া যায় (prothomalo.com)। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে মা-ছেলেকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের ফতুল্লায় ৭ সেপ্টেম্বর রাতে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা নাহিয়ান আজম ইভন (৩০) প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীদের হাতে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন হয়েছেন (jagonews24.com)। রাজধানী ঢাকাতেও মাদক কারবার ও স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ খুনের শিকার হচ্ছেন (prothomalo.com)।
এমনকি চোর সন্দেহে নিরীহ যুবককেও পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে – ১৮ সেপ্টেম্বর ফেনীতে গণপিটুনিতে এক তরুণ নিহত হওয়ায় এ ঘটনার বিচার দাবিতে স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভে নামতে বাধ্য হয়েছেন (sarabangla.net)।
আগস্টের অপরাধ চিত্র
গত আগস্ট মাসে সারা বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল প্রকাশে গণপিটুনি দিয়ে মানুষকে হত্যা। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনগুলো উদ্বেগজনক চিত্র উপস্থাপন করেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে মোট ২,৬১৬টি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে (tbsnews.net)। গড় হিসাবে এ বছরে প্রতি মাসে প্রায় ৩২৭টি করে হত্যাকাণ্ডের মামলা হচ্ছে, যেখানে ২০২৪ সালে মাসিক গড় ছিল প্রায় ২৮৭টি। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের পর সহিংস অপরাধের হার বেড়েছে বলে সরকারি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বছর জুড়ে নদীতে লাশ ভেসেছে
গত এক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে একের পর এক মরদেহ ভেসে উঠেছে। নৌ-পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৪৩টি করে মরদেহ দেশের নদীগুলো থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে, যেখানে ২০২৪ সালে এই গড় ছিল মাসে ৩৬টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসেই ৩০১টি মরদেহ নদীতে পাওয়া গেছে।
আগস্ট মাসেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন স্থানে চল্লিশের বেশি মরদেহ শুধু আগস্টেই উদ্ধার হয়েছে, যা মাসিক গড়ের কাছাকাছি। উদাহরণ হিসেবে, ২৩ আগস্ট একদিনেই রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদী থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় (ntvbd.com)। ওই দিন সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জের মাদারীপুর ঘাট এলাকায় একটি অজ্ঞাতনামা পুরুষ (প্রায় ৩৫ বছর) ও নারীর (প্রায় ৩০ বছর) মৃতদেহ হাত বাঁধা অবস্থায় ভেসে ওঠে।
একইদিন দুপুরে মীরেরবাগ এলাকা থেকে আরও একজন নারী ও একটি শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। তদন্তকারীরা দেখতে পান, মরদেহগুলো পানিতে ভাসতে না পারে এজন্য অপরাধীরা মৃতদেহের হাত ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তার সাথে বেঁধে নদীতে ফেলেছিল। এছাড়া উদ্ধারকৃত এক নারীর গলায় বোরকার হাতা দিয়ে এবং শিশুটির গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল – প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এতগুলি মরদেহ একই সাথে পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায় এবং নদীপথে যাত্রীদের মাঝেও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।
এর মাত্র চার দিন পরে, ২৭ আগস্ট, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নৌ-পুলিশ একটি মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে (thedailystar.net)। পরে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে জানা যায় এটি হাবিব (২৭) নামে এক যুবকের দেহ, এবং পুলিশ নিশ্চিত করে এটি ছিল নৃশংস হত্যাকাণ্ড – হত্যাকারীরা তাকে গলা কেটে হত্যা করে মাথা গায়েব করেছিল।
মরদেহগুলো কার, কিভাবে?
নদী থেকে উদ্ধারের সব মরদেহ যে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, তা নৌ-পুলিশের পরিসংখ্যানেই প্রতিফলিত। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে উদ্ধার ৩০১টি মরদেহের মধ্যে অন্তত ৪১টি ঘটনায় পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে (thedailystar.net)। অর্থাৎ প্রায় ১৪% নদীতে পাওয়া লাশের ঘটনায় সরাসরি হত্যার প্রমাণ মেলায় মামলা হয়েছে।
নৌ-পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কোনো মরদেহের অবস্থায় আঘাতের চিহ্ন, হাত-পা বাঁধা, গলায় রশি-কাপড় প্যাঁচানো ইত্যাদির ইঙ্গিত পেলেই তারা মামলাটি “অস্বাভাবিক মৃত্যু” থেকে আপগ্রেড করে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেন। উপরে বর্ণিত ২৩ আগস্টের চারটি মরদেহের ক্ষেত্রেই স্পষ্টতই খুন করে লাশ ফেলা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।
আবার অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ অত্যন্ত পচে যায় বা পরিচয় শনাক্ত করা যায় না, ফলে হত্যার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিললেও ভিকটিম অজ্ঞাত রয়ে যায়। পুলিশ জানাচ্ছে, উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩০% মরদেহের পরিচয়ই মেলেনি। জানুয়ারি-জুলাই সময়ের মধ্যে উদ্ধারকৃত ৩০১টি মরদেহের মধ্যে ৯২টি অশনাক্ত রয়ে গেছে। অপরিচয় ও ফরেনসিক জটিলতার কারণে অনেক হত্যাকারী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
তবু ২০২৫ সালে নদীতে লাশ পড়ে থাকার ঘটনা আগের বছরের তুলনায় স্পষ্টত বেড়েছে। বিগত বছরে (২০২৪ সালে) মোট ৪৪০টি লাশ নদী থেকে পাওয়া গেলেও ২০২৫ সালের মাত্র সাত মাসেই ৩০১টি লাশ পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলতে অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে নদীপথকে “ডাম্পিং জোন” হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র অনেক সময় খুন করার আগেই নদীর ধারে জায়গা বেছে রাখে, যাতে ঘটনা ঘটিয়ে সহজে লাশ পানিতে ফেলা যায়। পুলিশ কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে নদীতে লাশ ফেলার প্রবণতা একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর লাগাম টেনে ধরতে জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আগস্ট ২০২৫-এ দেশের সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের চিত্র
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কয়েকশ’ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে গণমাধ্যমসমূহ তথ্য দিচ্ছে। পুলিশের উপাত্ত অনুসারে এই সংখ্যা ৩০০-এর বেশি। আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোর ধরন বিচিত্র ছিল:
-
গণপিটুনি জনিত হত্যাকাণ্ড: মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (MSF)-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে আগস্ট মাসে কমপক্ষে ৩৮টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৪৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন (prothomalo.com)। গণপিটুনির ঘটনা সংখ্যা জুলাই মাসে তুলনায় কম হলেও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। জুলাইয়ে ৫১টি ঘটনায় ১৬ জন নিহতের বিপরীতে আগস্টে ৩৮টি ঘটনায় ২৩ জন নিহত হয়েছে। অন্য একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্যমতে আগস্টে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি। সংস্থাটি গতমাসে ২৫ জনকে পিটিয়ে হত্যার তথ্য দিয়েছে (thedailystar.net)। অর্থাৎ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা মাসটিতে ভয়াবহ মাত্রায় ছিল।
-
পারিবারিক ও নারী সহিংসতা: এইচআরএসএস তাদের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে বলছে, এ মাসে কমপক্ষে ৩০ জন নারী ঘরোয়া সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৩ জন নারী/কন্যা শিশু। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাবলী আগস্টে আশঙ্কাজনক মাত্রায় ছিল – মোট ১৫৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৬৪টি ধর্ষণের ঘটনা এবং এর মধ্যে ৩৩ জন ভিকটিম ছিলেন ১৮ বছরের কম বয়সী (thedailystar.net)।
-
শিশু হত্যা: আগস্ট ২০২৫ এ কমপক্ষে ১৭ জন শিশু বিভিন্ন নির্যাতন ও সহিংসতায় নিহত হয়েছে বলে এইচআরএসএস রিপোর্ট করেছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে অনেক শিশু। সংস্থাটির দেয়া তথ্য মতে মোট শিশু নির্যাতনের ঘটনা ১৩৩টি।
-
সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতন: আগস্ট মাসে গণমাধ্যমকর্মীদের উপর সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করে। মাসের শুরুতে ৭ আগস্ট গাজীপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে (৩৮) হত্যা করা হয়। একইভাবে ২২ আগস্ট প্রবীণ সাংবাদিক বিভূরঞ্জন সরকার নিখোঁজের দুই দিন পর তাঁর মরদেহ মেঘনা নদীর তীরে পাওয়া যায়।
এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, আগস্টে সারাদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন হামলা-হুমকির ঘটনায় মোট ৩৩টি ঘটনায় ৯৬ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন, যা জুলাই মাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। জুলাই মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ১৯টি ঘটনায় ৩০ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। -
রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যাকাণ্ড: বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী আগস্ট মাসে রাজনৈতিক সংঘাতে কমপক্ষে ৪৯টি সহিংস ঘটনার খবর মিলেছে। এসব ঘটনায় ২ জন নিহত এবং প্রায় ৫৪৯ জন আহত হয়েছেন। বেশিরভাগ রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছে অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল, মিছিল-সমাবেশ বা চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে। এইচআরএসএস বলছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আগস্টে ৩৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে যেখানে ২ জন মারা গেছেন। আবার বিএনপি-আওয়ামী লীগের মুখোমুখি সংঘর্ষেও ২ জন নিহতের ঘটনা আছে। এছাড়া অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হামলায় আটজন রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক নিহত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
-
অন্যান্য হত্যা ও অপরাধ: ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ, ডাকাতি বা সন্ত্রাসী হামলা ইত্যাদি কারণেও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ হয়েছে। পুলিশের হিসাবেই যেহেতু আগস্টে তিন শতাধিক হত্যা মামলা হয়েছে, তাই আরও বহু বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড এর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত আছে।
জুলাই ২০২৫-এর সাথে তুলনামূলক পরিস্থিতি
আগস্ট মাসের এই চিত্রের সাথে জুলাই ২০২৫-এর পরিস্থিতি তুলনা করে কিছু মিশ্র প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে গণপিটুনি জনিত হত্যার ঘটনা জুলাইয়ে সংখ্যায় বেশি (৫১টি) হলেও নিহতের সংখ্যা ছিল কম (১৬ জন) (prothomalo.com)। যেখানে আগস্টে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ৩৮টি, কিন্তু প্রাণহানি বেশি হয়েছে (২৩ জন)। আবার সাংবাদিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে খারাপ হয়েছে। জুলাইয়ে ১৯টি ঘটনায় ৩০ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আগস্টে তা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৩৩টি ঘটনায় ৯৬ জন পর্যন্ত সাংবাদিক হয়রানি-হুমকির শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় জুলাই মাসেও হতাহতের ঘটনা ঘটে, তবে আগস্টে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন পক্ষের সংঘাতে মৃত্যুর খবর বেশি উঠে এসেছে (thedailystar.net)। সামগ্রিকভাবে ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্ট – উভয় মাসেই দেশে সহিংস অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের মাত্রা খুবই উঁচু ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের সরকার পতনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি শুরু হয়েছে তা এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি (thediplomat.com)।
নদীতে লাশের হিড়িক নিয়ে উদ্বেগ
নদীতে ঘনঘন লাশ ভেসে উঠছে – এমন খবর শোনার পর নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, “দেশের নদীগুলো কি তবে মরদেহ ফেলার ডাম্পিং জোনে পরিণত হচ্ছে?”
গত মাসের শেষে মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর বিভিন্ন স্থানে চারটি লাশ পাওয়ার নজিরও আছে বলে জানাচ্ছেন কেউ কেউ (instagram.com)। ঢাকার অন্যতম প্রধান নদী বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে এমন ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীবাসীও শঙ্কিত।
অপরাধে উৎসাহ বন্ধ করা জরুরি
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, সমাজে সহিংসতার প্রবণতা কমাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
”বিগত সরকারের সমর্থক বা আওয়ামী লীগের কর্মী হলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়ে হত্যাকে জায়েজ করা বন্ধ করতে হবে এবং এসব অত্যাকারীদের দায়মুক্তি প্রত্যাহার করতে হবে,” ভয়েসকে বলেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পী তাজুল ইমাম।
তিনি মনে করেন, “বাংলাদেশে অপরাধ বিস্তারের প্রধান কারণ হল, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের খতম করার জন্য গত একবছর থেকে ব্যাপক হারে সরকার মব লেলিয়ে দিয়েছে। পুলিশ এবং আর্মির উপস্থিতিতে মব দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির উপর হামলা চালানো হয়েছে। ইউনুসের নেতৃত্বধীন সরকার বহুমানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে পশ্রয় দিয়েছে।“
“বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সংবাদ প্রকাশের অনুমতি সংবাদ মাধ্যমের নেই। নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থক হলে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বেঁচে থাকার অধিকার কিছুই নেই। সরকারের অন্যায় অত্যাচারের বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। ফলে অপরাধ আরও বাড়ছে,” বলেছেন বিশিষ্ট আইনবিদ ড. এসএম মাসুম বিল্লাহ।
”নদী-পাড়ের অজানা লাশ থেকে গ্রাম-শহরের ঘরে বাইরে ঘটে চলা হত্যাকাণ্ড – প্রতিটি ঘটনাই গভীরভাবে তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে,” মনে করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে তারা প্রতিটি ঘটনার গভীরে পৌঁছে ব্যবস্থা নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, শীতলক্ষ্যায় মাথাবিহীন লাশের মামলাটিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিহতের পরিচয় শনাক্তের পর তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে (ittefaq.com.bd)।

