হামাসমুক্ত প্যালেস্টাইন গড়ার পক্ষে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সমর্থন

হামাসমুক্ত প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে জাতিসংঘে ভোট দিয়েছে মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

প্রতিবেশী ভারতও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত এই “নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশন”-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে।  গত শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ১৪২টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, বিপক্ষে যায় মাত্র ১০টি দেশ এবং বিরত থাকে ১২টি।

প্রস্তাবের সারমর্ম

ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে আনা এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান জরুরি। ঘোষণায় স্পষ্ট ভাষায় হামাসকে নিন্দা জানানো হয়েছে এবং তাদেরকে গাজা থেকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে ও অস্ত্রসম্ভার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি, এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা মিশনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে সোচ্চার। নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশনে বাংলাদেশের “হ্যাঁ” ভোট সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন জানিয়েছে, জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঢাকার কূটনৈতিক মহল বলছে, এই ভোট বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নীতি—“ফিলিস্তিনের প্রতি অটল সমর্থন”—এর প্রতিফলন।

বিরোধী দেশগুলোর অবস্থান

যে ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি এবং কয়েকটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র। তাদের যুক্তি হলো, প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং এটি হয়তো চলমান শান্তি প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে পারে। তবে সমর্থনকারী দেশগুলোর মতে, হামাসকে ক্ষমতার বাইরে রেখে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সমাধান টেকসই হবে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাবকে “ভুল সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত” বলে উল্লেখ করেছে এবং এটিকে “ভ্রান্ত বার্তা” বলে আখ্যা দিয়েছে। বিপরীতে ইউরোপের বড় শক্তি ফ্রান্স, এবং আরব বিশ্বের প্রধান দেশ সৌদি আরব এই প্রস্তাবের মূল উদ্যোক্তা হিসেবে জোরালো সমর্থন দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের সময় কিছু পশ্চিমা দেশ ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য

সরকারের ভাষ্যকাররা বলছে, বাংলাদেশের ভোট মূলত মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, একইসঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করছে। এটি ঢাকার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তবে, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই অবস্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ একটি সামরিক ও ইসলামপন্থী সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছে যে, কয়েক শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বেড়েছে, সাংবাদিক ও শিক্ষকদের হয়রানি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মাঝেই জাতিসংঘে ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের সমর্থন মূলত তার পুরোনো পররাষ্ট্র নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার চেষ্টা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশন নামক জাতিসংঘে গৃহিত এই প্রস্তাবনা বাধ্যতামূলক নয়। তবে এটি ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য এক ধরনের রোডম্যাপ তৈরি করছে বলে অনেক বিশ্লেষকের মত।

যুদ্ধবিরতি, জিম্মি মুক্তি, হামাসের সরে যাওয়া এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর—সব মিলিয়ে এটি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সমর্থন কেবল একটি ভোট নয়, বরং ঐতিহাসিক নীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতীক।

spot_img