চাকরির বাজারে ‘হাহাকার’: বেকার বাড়ছে, বেতন–দাম তাল মিলছে না

এক বছরে বেকার সংখ্যা বেড়ে ২৭ লাখে, কমছে কর্মসংস্থানের সুযোগ

ঢাকা, ১৭ আগস্ট ২০২৫ — কোটা–বিতর্কে তুমুল রাজনীতি পেরিয়ে এক বছর। প্রতিশ্রুতি ছিল— কোটা ব্যবস্থা বাদ দিলে সরকারি চাকরি পাওয়া সহজ হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা আজ হতাশায় পরিণত হয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজার আগের চেয়ে কঠিন। চাকরির বাজারে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি, বরং বেকারের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে বেকার দাঁড়িয়েছে ২৭.৩ লাখে; ২০২৫ সালের শুরুতে হার আরও বেড়ে ৪.৬৩%—এমন চিত্র দিচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপ।

বেকারের সংখ্যা বাড়ছে

বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ লাখে। বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শ্রমশক্তি দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৮৯ লাখে।

শিল্প খাতে কর্মসংস্থান এক দশক ধরে কমছে। ২০১৩ সালে এ খাতে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২১ লাখ। ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ১ কোটি ২০ লাখে। বিদেশে কর্মসংস্থানেও ধস নেমেছে। ২০২৪ সালে মাত্র ১০ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ পেয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ কম।

সন্ত্রাস থেকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়

সন্ত্রাসকেই অর্থনৈতিক বেকারত্ব সংকটের প্রধান কারণ মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। ২০২৪ এর সন্ত্রাসমূলক জূলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে সরকারের ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের উপর যত্রতত্র হামলা করা হয়। সর্বত্র শুরু হয় ব্যপক চাঁদাবাজী। সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লূটপাট ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি বড় বড় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজীকে গ্রেপ্তারের পর তার প্রতিষ্ঠানগুলো লুটপাট করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় মুহাম্মদ ইউনুসের নতুন সরকারের সমর্থকরা। সেই আগুনের বহু মানুষের প্রাণহানী ঘটে। দেশজুড়ে এমন ঘটনা অনেক।

গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেক শিল্পোদ্যোক্তা। গণপিটুনি, চাঁদাবাজী ও পুলিশের হয়রানি থেকে আত্মরক্ষার জন্য বড়, ছোট ও মাঝারি কয়েক লাখ বিনিয়োগকারী গা ঢাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে জীবন রক্ষায় দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

চাঁদাবাজী ও মব সন্ত্রাস করে ধরা পড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা জানে আলম অপু এক ভিডিও বার্তায় এসব ঘটনায় ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ঊর্দ্ধোতন পুলিশ কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তার ভাইরাল হওয়া ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও অন্যদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় তারা দেশের বিভিন্নস্থানে মব-সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজীর ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন।

গত এক বছর যাবত সরকার ও তার সমর্থকদের অত্যাচারের ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ায় কর্ম সংস্থানের উপর এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ক্যাম্পাসের প্রশ্ন: পড়াশোনা শেষে কী?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব পিয়াস ভয়েসকে বললেন, ”আড্ডার শেষে সবাই আটকে যায় এক প্রশ্নে—এরপর কী?”

একই কথার প্রতিধ্বনি করলেন সাবেকুন নাহার, “বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের আড্ডায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— পড়াশোনা শেষে কী করবে? কেউ বলে বিদেশে যাবে, কেউ সরকারি চাকরি চেষ্টায় আছে, আবার অনেকে বলে যেকোনো চাকরি পেলেই করবে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুকুমার পোদ্দারের বক্তব্য, ”নিত্যপণ্যের দাম লাফাচ্ছে; ১১–২০ গ্রেডের বেতন দিয়ে টিকে থাকা কঠিন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ১০ লাখ বিদেশে যায়। দেশে বাকি ১৫ লাখের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ নেই। বিনিয়োগ কমে গেছে, টাকা পাচার হচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষতা গড়ে উঠছে না। তাই বেকারত্ব বাড়ছে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক নুরুল মোমেন বলেন, “প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। যে চাকরিই মিলছে, তার বেতন এত কম যে সচ্ছলভাবে চলা কষ্টকর। বর্তমান বেতন কাঠামো অন্তত ১০ বছর পুরনো, জীবনযাত্রার মান এর মধ্যে অনেক বদলে গেছে।”   

পোশাক শিল্পে চাপ, চাকরি ঝুঁকিতে

রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্ডার সঙ্কোচন ও কারখানা বন্ধে লাখ লাখ কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিজিএমইএ ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক পোশাক রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে— যা চাকরি ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকির সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

রেমিট্যান্স–রূপালি দাগ

২০২৪ সালের শেষে/অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে রেমিট্যান্স ১০.৬% বেড়ে ৭.২৩ বিলিয়ন ডলার—তবে যেহেতু ২০২৪-এ বিদেশগমন কমেছে, আগামী বছর প্রবাহে চাপ পড়তে পারে।

আইএমএফের সাথে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ে সম্মতিপত্র—মুদ্রাবাজার ও রাজস্ব সংস্কারের অঙ্গীকার—এতে স্থিতি ফিরবে, আশা নীতিনির্ধারকদের। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য চাই দক্ষতার উন্নয়ন, শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ, নারী ও যুব কর্মসংস্থান, আর দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ।

সংখ্যার খোঁজে

  • বেকারত্ব: ২০২৪ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে ২৭.৩ লাখ; পরের প্রান্তিকে হার ৪.৬৩%—বিবিএস।
  • শিল্পখাত: গত এক দশকে উৎপাদন খাতে চাকরি কমেছে—নতুন গ্র্যাজুয়েটদের চাপে বাজার ভিড়ছে।
  • বিদেশে কর্মসংস্থান: ২০২৪ সালে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে গেছে—আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৭% কম। বিএসএস সরকারি হিসেবে সংখ্যা ৯.৯ লাখের নিচে।
  • দাম ও আয়: দুই অঙ্কের কাছাকাছি মুদ্রাস্ফীতি—বেতন দিয়ে বাজার সামলানো কঠিন।

তরুণদের মনে প্রশ্ন

বেকারত্ব বাড়ায় তরুণ প্রজন্মের হতাশা তীব্র হচ্ছে। যারা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করছে, তাদের অনেকেই বলছে, দেশীয় চাকরির বাজারে আর কোনো আশার আলো নেই। কেউ বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, কেউ আবার ক্ষুদ্র উদ্যোগে আত্মকর্মসংস্থানের চেষ্টা করছে।

এক বছরের ব্যবধানে ছাত্র আন্দোলনের দাবিগুলো পূরণ না হওয়ায় তরুণদের মনে প্রশ্ন—আন্দোলনের ফসল কে খেল?

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles