সাম্প্রদায়িক উত্থানের ছায়া: অস্ত্রের ঝনঝনানিতে হারিয়ে যাচ্ছে শিল্প-সংস্কৃতি

সাম্প্রদায়িক উত্থান, সাংস্কৃতিক দমননীতি এবং রাষ্ট্রের নিরবতা বাংলাদেশকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে

ডেভিড বাঙালি, ঢাকা:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন রাষ্ট্র নির্মাণের সংগ্রাম। একাত্তরের সেই চেতনাকে বারবার ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে, কখনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে, কখনো সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনে। আজ, ২০২৫ সালে এসে আমরা নতুন করে একটি বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে মৌলবাদী জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেই নয়, জাতির সংস্কৃতিকেও গ্রাস করছে।

গত এক বছরে দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে তেমন কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখা যায়নি। নজরুল-রবীন্দ্র চর্চা, জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতা, উদীচী বা ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃজনশীল পরিবেশনা প্রায় অনুপস্থিত। শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্যচর্চা বন্ধের পথে। কবিতা, নাটক, লোকগান এসব সৃষ্টিশীল মাধ্যমগুলো যেন এখন নিছক ‘ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এটা কেবল অবহেলার ফল নয়, বরং সচেতনভাবে চালানো একটি সাংস্কৃতিক দমননীতি। মৌলবাদী গোষ্ঠী শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার আশ্রয়ে নয়, তারা প্রশাসনের নিরব সহযোগিতায় সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছে। তারা চায় না বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চর্চা হোক। এদের চোখে রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু’, নজরুল ‘বিদ্রোহী’, মঞ্চনাটক ‘অশ্লীলতা’, আর নৃত্য ও সংগীত ‘নিষিদ্ধ’।

একটি অদৃশ্য ভয়ের আবহ তৈরি করা হয়েছে। জেলায় জেলায় দেখা যায় অস্ত্রধারীদের তান্ডব, গুটিকয়েক ‘সন্ত্রাসী’ যাদের হাতে সমাজ জিম্মি। যে কারো বক্তব্য বা অনুষ্ঠান যদি মৌলবাদীদের অপছন্দ হয়, তাহলে সেটি বন্ধ হয়ে যায়, হামলার শিকার হয় শিল্পী কিংবা আয়োজক। অথচ রাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে থাকে।

এই পরিস্থিতি পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের আদলে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরির ইঙ্গিত দেয়। ধর্মের নামে রাজনীতি, সংস্কৃতির নামে নিষেধাজ্ঞা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিকার দৃষ্টি বর্তমান বাংলাদেশকে ক্রমেই পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম শুধু সন্ত্রাস নয়, সাংস্কৃতিক অন্ধকারেই জন্ম নেবে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে একটি কবিতা পাঠ, একটি নাট্য উৎসব, এমনকি একটি বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়াটাও এখন অনুমতি-সাপেক্ষ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু শিল্প ও সংস্কৃতিকে নয়, জাতির আত্মাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে প্রথমে তার সংস্কৃতিকে হত্যা করতে হয়। মনে রাখতে হবে, অস্ত্র দিয়ে দেশ চলে না, দেশ চলে সংস্কৃতি, শিক্ষাবোধ, গণতন্ত্র ও মানবিক চেতনা দিয়ে। আজ যদি মৌলবাদকে প্রতিহত করতে না পারি, আগামীকাল আমাদের কেউ আর রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারবে না, কেউ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়ার সাহস রাখবে না।

বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল একটি মুক্তচিন্তার, বৈচিত্র্যপূর্ণ, সমন্বয়ময় সংস্কৃতির জন্য। তাই এই বিপদে আমাদের আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের শিশুদের হাতে আবার তুলে দিতে হবে বাঁশি, বই, রঙতুলি। আর সেই শক্তি দিয়েই রুখে দিতে হবে এই সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ।

spot_img