সাবেক এমপির বাসায় চাঁদাবাজি করে গ্রেপ্তার পাঁচ: ’বৈষম্যবিরোধী’দের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ

শাম্মী আহমেদের বাড়িতে ৫০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আটক। সেনা-সমর্থিত এই ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগ পতনের পর থেকে চাঁদাবাজি, গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভিন্নমত দমনের মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।

সিয়াম  পারভেজ, ঢাকা –

রাজধানীর গুলশানে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদ–এর বাসায় চাঁদা দাবির অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছা) নেতাকর্মী।

পুলিশ জানায়, আটককৃতরা নিজেদের “বৈছার সদস্য পরিচয় দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। তারা গত ১৭ জুলাই শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে তাঁর স্বামীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রথমে ১০ লাখ টাকা আদায় করে এবং বাকী টাকা নিতে শনিবার (২৬ জুলাই) রাতে আবার ঐ বাসায় হাজির হয়। তবে পরিবারের সদস্যদের আগাম সংবাদে প্রস্তুত পুলিশ হাতেনাতে পাঁচজনকেই ধরে ফেলে।

গ্রেফতার পাঁচজন হলেন- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, সদস্য মো. সাকাদাউন সিয়াম ও সাদাব, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জানে আলম অপু ও সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান।

গুলশান থানার ওসি হাফিজুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, এ ঘটনায় শাম্মী আহমেদের স্বামী আবু জাফর একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করছেন।

“বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য পরিচয়ে পাঁচ যুবক শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে। সেদিন শাম্মী বাসায় না থাকায় তাঁর স্বামীর কাছ থেকে ১০ লাখ নিয়ে যায়। পরদিন অবশিষ্ট ৪০ লাখ নিতে গেলে আমরা খবর পেয়ে তাদের আটক করি,” ওসি হাফিজুর বলেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধৃতদের কাছে থেকে আগেও আদায় করা ১০ লাখ টাকার কিছু অংশ এবং টাকা গ্রহণের ভিডিও প্রমাণ উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গেছে। এই চক্রের পলাতক অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সংগঠনের সাবেক নেত্রীর আক্ষেপ: “শেকড় অনেক গভীরে”

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপরাধের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংগঠনটির সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এবং মুখপাত্র উমামা ফাতেমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বহু অপরাধের পরও প্রথমবারের মতো এসব ছাত্রনেতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ল।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় উমামা লিখেছেন, শাম্মীর বাসায় চাঁদাবাজির খবর শুনে “চারিদিকে সবাই এমন অবাক হওয়ার ভান করছে যে বিষয়টা হাস্যকর লাগছে”। তিনি ব্যঙ্গ করে আরও লেখেন, “দুঃখিত বন্ধুরা, বলতে হবে এই প্রথম কোনো চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তারা পুলিশের হাতে ধরা খেল। ঠিকমতো খোঁজ নিলে বুঝবেন, এদের শেকড় অনেক গভীরে”

উমামা ফাতেমা গত বছরের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন এবং পরে মুখপাত্র হন। গত মাসে তিনি এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সরে দাঁড়ান এবং বেরিয়ে এসে সংগঠনের ভেতরে চলা অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হন।

উমামা তাঁর পোস্টে অভিযোগ করেন, সংগঠনের শীর্ষ সমন্বয়করা বিভিন্ন সময়ে গুলশান-বনানীর গ্যাং কালচার, হামলা-মারপিট, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে জড়িত কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবককে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি আটককৃত রিয়াদের কথা উল্লেখ করেন – রিয়াদ গত ডিসেম্বরে রূপায়ণ টাওয়ারে উমামাদের সামনে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার ও হামকি-ধমকি প্রদর্শন করে, এবং তাকে থামাতে গেলে উল্টো নারীদের ওপর চড়াও হয়।

উমামা বলেন, “ওই ঘটনার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে হুমকি, মারামারি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। আমি মোটেও অবাক হইনি, কারণ ততদিনে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের সর্বত্র এই ধরনের লোকজনের আনাগোনা টের পাওয়া যেত”

তার দাবি, সংগঠনের ভেতরে যে কোনো দুর্নীতি বা অপরাধের কথা তুললেই ঊর্ধ্বতনদের নীরব সমর্থন মেলে – অভিযোগ উত্থাপনকারীরা উল্টো কোণঠাসা হয়ে যান। উমামার ভাষায়, “কে, কীভাবে পারছে, এই প্ল্যাটফর্মটাকে নষ্ট করেছে”, তাই চাঁদাবাজির খবর আসার পর লোকজনের ভান করা নিষ্পাপ বিস্ময় তাকে হতবাক করেছে।

সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষায় এখন দায়সারা ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। ঘটনার পরপরই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বর্তমান সভাপতি রিফাত রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ইনাম এক বিবৃতিতে জড়িত তিন নেতাকে স্থায়ী বহিষ্কার করার কথা জানান। বহিষ্কৃতদের মধ্যে গুলশান ঘটনায় আটক ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মুন্না ও সদস্য সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাব রয়েছেন। এই চাঁদাবাজ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরো দুইজন অন্য একটি ছাত্র সংগঠনের (গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ) সক্রিয় কর্মী হওয়ায় সে সংগঠন থেকেও তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

রিফাত রশিদ সাংবাদিকদের বলেছেন, “চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের নীতি জিরো টলারেন্স”, অর্থাৎ এ ব্যাপারে সংগঠনের কেন্দ্রীয় অবস্থান আপসহীন। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন – সংগঠনের ভেতরে দীর্ঘদিনের অপরাধ প্রবণতা কি কিছু লোককে বের করে দিলেই মিটবে, নাকি এগুলো শীর্ষ নেতৃত্বের যোগসাজশে দীর্ঘকাল চলেছে?

সেনাসমর্থিত সরকার ও ‘ছাত্রশক্তি’র দাপট

বাংলাদেশে গত বছরের সংঘাতে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পেছনে যে ছাত্র আন্দোলন কাজ করেছিল, তার মূল চালিকা শক্তি ছিল এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ক্ষমতাসীন দলের কোটা সংস্কারবিরোধী নীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন জুলাই ২০২৪-এ দেশজুড়ে রূপ নেয় সহিংস গণঅভ্যুত্থানে। ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগে বাধ্য হন। আন্দোলনকারীদের দাবিমতো, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভেঙে দিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। শপথ গ্রহণের আগে প্যারিসে অবস্থানরত ৮৪ বছর বয়সী ইউনূস ছাত্রনেতা ও তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে এই দায়িত্ব মেনে নেন। নতুন সরকারকে সেনাবাহিনী সরাসরি সমর্থন দেয়, আর ইউনূসও “এই ছাত্ররাই তাকে ক্ষমতায় এনেছে” বলে প্রকাশ্যে স্বীকারোক্তি দেন – যা কার্যত ছাত্র আন্দোলন এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের এক অঘোষিত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে অনেকেই আশা করেছিলেন যে তীব্র রক্তক্ষয়ের পর দেশে আইনের শাসন ও শান্তি ফিরবে। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিগত এক বছরে উল্টো নৈরাজ্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা বেড়েছে – যার বড় অংশ হচ্ছে সরকারসমর্থিত ছাত্র-যুবকদের হাতে। হাসিনার পতনের পর বিজয় উল্লাসের আড়ালে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা এই সহিংস “মবের বিচারের” মুখ্য টার্গেট হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা আসক (অধিকার সুরক্ষা কেন্দ্র) জানায়, ২০২৪ সালে কমপক্ষে ১২৮ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭৫% ঘটেছে আগস্টের পর।

“হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রতিশোধস্পৃহার বশে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা হঠাৎ বেড়ে গেছে,” মন্তব্য করেন আসক-এর জ্যেষ্ঠ সদস্য আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। অন্য দুইটি সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-ও একই সময়ে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা যথাক্রমে ১৪৬ ও ১৭৩ জন বলেছে, যা আগের বছরের গড়ের তিনগুণের বেশি।

এই সহিংসতার ভয়াবহতা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজশাহীতে ছাত্রলীগ (বিসিএল) নেতা মাসুদ রানাকে সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকার উপকণ্ঠে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী শামীম আহমেদ একই মাসে পিটুনিতে নিহত হন।

নিহত মাসুদের স্ত্রী বিউটি আরা সাংবাদিকদের জানান, তাঁর স্বামী আগেও একবার গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে একটি পা হারিয়েছিলেন; শেষ পর্যন্ত আর প্রাণে বাঁচতে পারলেন না। “আমি সদ্য সন্তান প্রসব করেছিলাম, তার মধ্যে স্বামীর লাশ দেখতে মর্গে ছুটে যাই,” বলছিলেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিউটি।

“আমরা মামলা করেছি, কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি নেই,” তাঁর অভিযোগ। প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং বিচারহীনতার ফলে ছাত্র-জনতার হাতে নিজস্ব বিচার চালানোর প্রবণতা বাড়ছে বলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন।

পক্ষান্তরে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যামোফ্লেজেও কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আসক-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪ সালে ২১টি কথিত “ক্রসফায়ার” বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি ঘটেছে আগস্টের পর অর্থাৎ নতুন সরকারের শাসনামলে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব টার্গেট হচ্ছেন ক্ষমতাচ্যুত দলের কর্মী-সমর্থক অথবা সাবেক প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন মন্তব্য করেছেন, “মানবাধিকার পরিস্থিতি যে উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না” – আগের সরকারের সময় যেমন গুম-খুন হয়েছিল, বর্তমানেও ভিন্ন পদ্ধতিতে নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক ও ভিন্নমতালম্বীদের ওপরও হামলা ও হয়রানি চলছে বলে রিপোর্ট পাওয়া গেছে, অনেকটা পূর্ববর্তী সরকারের দমননীতির প্রতিফলন যেন।

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরব হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থা আওয়ামী লীগ পতনের পর ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও নিপীড়নের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক গত বছরের অগাস্টে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশে জুলাই-অগাস্টে যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন হয়েছে তার ওপর স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত চালানো হবে। তাঁর আহ্বানে সেপ্টেম্বরে জেনেভা থেকে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশে আসে এবং প্রতিবেদন তৈরি করে, যেখানে উল্লেখ করা হয় যে “৫ আগস্ট হাসিনার পদত্যাগের পর উল্লাসকারীদের কিছু অংশ বিরোধীপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সহিংসতা চালিয়েছে, এতে শত শত মানুষ হতাহত হয়েছে”। জাতিসংঘের মহাসচিবের তরফ থেকেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন আইনের শাসন ও সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নতুন প্রশাসনকে উদ্দেশ করে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছে, সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর যে “প্রতিশোধের সংস্কৃতি” চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অ্যামনেস্টির উপ-আঞ্চলিক পরিচালক বাবু রাম পান্ত বলেন, “সবার জন্য মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, সেটা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ জরুরি… সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দোষীদের বিচারে আনতে হবে”। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিশেষ করে গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর হিন্দু, আহমদিয়া, পাহাড়ি আদিবাসীসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, উপাসনালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যে উদ্ধত জনতা হামলা চালিয়েছে তার উদাহরণ তুলে ধরছে। ক্রিসমাসের আগের রাতে বান্দরবানে খ্রিস্টান ত্রিপুরা পল্লীতে ১৭টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় – ইউনূসের দপ্তর ঘটনার নিন্দা করে একে “ঘৃণ্য ও অগ্রহণযোগ্য” বললেও বাস্তবে অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বেগ জানিয়েছে এবং সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সরাসরি ড. ইউনূসের সরকারের সমালোচনা করেছে। তারা বলে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার উল্টো হাসিনা-সমর্থকদের টার্গেট করে দমননীতি গ্রহণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, মে ২০২৫-এ ইউনূস সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সব কার্যক্রম থেকে “সাময়িক নিষিদ্ধ” ঘোষণা করে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় দলটির মিছিল, সভা, প্রচারপত্র, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থনসূচক পোস্টও বেআইনি হয়ে যায়। এর পরপরই নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করে, বাস্তবিক অর্থে বর্তমানে দেশের প্রধান বিরোধী দলকে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, “শেখ হাসিনার সরকার যেমন ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিরোধীদের দমন করেছিল, একই পদ্ধতিতে আওয়ামী সমর্থকদের কণ্ঠরোধ করাও মৌলিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের শামিল”। গত এক বছরে অভিনেতা, আইনজীবী, শিল্পী থেকে শুরু করে শত শত সাধারণ লোকজনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ একটাই – তাঁরা নাকি “ফ্যাসিস্ট হাসিনা শাসনকে” সমর্থন করতেন। মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা দুর্বল করে এবং ট্রাইবুনালের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ক্ষমতা আইন করে, ইউনূস সরকার একদলীয় শাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।

দেশের ভেতরে তীব্র মেরুকরণ এবং ছাত্র-যুব জঙ্গিদের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আতঙ্ক বিরাজ করছে। একসময় যে ছাত্র আন্দোলন “বৈষম্যবিরোধী” স্লোগান নিয়ে শুরু হয়েছিল, তাদেরই কিছু সদস্য এখন অভিযোগের কাঠগড়ায় চাঁদাবাজ, লুটপাটকারী ও গুন্ডা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সামরিক সমর্থনপুষ্ট সরকারের সহযোগী হওয়ায় এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ-প্রশাসনও অনেক ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত – এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল)–কে ব্যান করার দাবিতে দেশজুড়ে “বৈষম্যবিরোধী” কর্মীরা মিছিল করেছে এবং অক্টোবরে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিএলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। “বৈষম্যবিরোধী” নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে বলছেন যে, “ছাত্রলীগের কার্যক্রম বাংলাদেশে চালাতে দেওয়া হবে না। তাদের সব নেতাকর্মীকে চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে”। কিন্তু বিশ্লেষকরা পাল্টা জিজ্ঞাসা তুলছেন – যদি ছাত্রলীগের জবাবদিহি চাই, তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিজেদের অপরাধের জবাবদিহি কোথায়? সাম্প্রতিক চাঁদাবাজি কাণ্ডসহ একের পর এক সহিংস অপকর্মের অভিযোগ প্রমাণ করছে যে ক্ষমতার মদদে “বৈষম্যবিরোধী” কর্মীরা একপ্রকার নতুন ‘ছাত্রলীগ’ হিসেবেই ত্রাস চালাচ্ছে, যারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবছে। বাংলাদেশ কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখছে – ক্ষমতা বদল হলেও দলীয় সন্ত্রাস ও অধিকার হরণের চক্র একইভাবে চলছে? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, আসন্ন নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে দেশে স্থায়ী শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।

spot_img