শ্যামগঞ্জের শহীদ সুধীর বড়ুয়া: বিস্মৃত এক বীরের স্মৃতিসৌধ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে স্থানীয়দের জোরালো আহ্বান

আজ ২৬শে মার্চ ২০২৬, ময়মনসিংহের শ্যামগঞ্জে ১৯৭১-এর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সুধীর বড়ুয়ার স্মৃতি চত্বরে দাঁড়িয়ে কিছু চরম সত্য উচ্চারণকে নিজেদের দায় বলে মনে করছি। একইসঙ্গে শহীদ বড়ুয়া স্মৃতি চত্বরটি সংরক্ষণে অবহেলা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে শহীদ বড়ুয়া স্মৃতি চত্বরটি পুনর্গঠনের জোর দাবি জানাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ অত্যন্ত।

কে ছিলেন সুধীর বড়ুয়া

চট্টগ্রামের রাউজান থানার আবুরখিল গ্রামে ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন সুধীর বড়ুয়া। পিতা নীরেন্দ্র লাল বড়ুয়া ও মাতা মল্লিকা রাণী বড়ুয়ার সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। চার ভাই ও তিন বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা এই বীর সেনা পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

হাবিলদার পদে থেকে ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর নেত্রকোণা মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে শ্যামগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহের দিকে পালাচ্ছিল। এ সময় কৌশলগতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসে একদল পাকিস্তানি সেনা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের কারণে তাদের নিজেদের পক্ষ মনে করেন মুক্তিযোদ্ধা সুধীর বড়ুয়া। তাকে দেখা মাত্রই পাকিস্তানি ঘাতকেরা সুধীর বড়ুয়ার দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং সাথে সাথেই ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন।

স্থানীয়দের মতে, বর্তমান শ্যামগঞ্জ পল্লী হাসপাতালের সামনে বা তার আশপাশেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার মরদেহ শ্যামগঞ্জ রেলমাঠের উত্তরে সমাধিস্থ করা হয়।

স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ইতিহাস

শহীদ সুধীর বড়ুয়ার স্মরণে শ্যামগঞ্জে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়, যা অনেকটা অমর একুশের স্মৃতিস্তম্ভের আদলে গড়ে ওঠে।

এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আঃ রহমান (বড়রিয়া) ও আঃ খালেক (সাবেক প্রধান শিক্ষক, শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়)। রড ও সিমেন্ট সরবরাহ করেন ইসমাইল হোসেন ও তারু মিয়া। পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন পাঞ্জর চেয়ারম্যান জসিমউদ্দীন সরকার এবং মোয়াজেদ আলী খান (ডায়মন্ড/ডুমন)।

১৯৭২ সালে প্রখ্যাত শিল্পী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শাহতাবউদ্দিন স্মৃতিসৌধটির আধুনিক নকশা প্রণয়ন করেন, যেখানে বাংলাদেশের মানচিত্রকে শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।

অবহেলা ও বিকৃতির অভিযোগ

সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন দুর্ঘটনা, বিশেষ করে ট্রাকের ধাক্কায় স্মৃতিসৌধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে এর মূল নকশা ও স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য বিকৃত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়রা মনে করেন, সঠিক প্রকৌশল পরিকল্পনা ছাড়া বারবার সংস্কার করায় স্মৃতিসৌধটি তার ঐতিহাসিক ও নান্দনিক মর্যাদা হারাচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও সীমিত প্রচারণা

৯ ডিসেম্বর শ্যামগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করলেও এটি স্থানীয় পর্যায়ে তেমনভাবে উদযাপিত হয় না। তবে ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এখানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে থাকে।

বর্তমানে স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন সড়কটি “শহীদ সুধীর বড়ুয়া রোড” নামে পরিচিত।

স্থানীয়দের দাবি ও প্রস্তাবনা

দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন—শ্যামগঞ্জ উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ, সচেতন শ্যামগঞ্জ, উদীচী, সিপিবি এবং গ্রীণ গিফট মানবসম্পদ উন্নয়ন বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচির মাধ্যমে স্মৃতিসৌধের উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস পাওয়া গেলেও বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।

স্থানীয়দের প্রধান দাবিগুলো হলো—
* স্মৃতিসৌধের মূল নকশা অক্ষুণ্ণ রেখে পুনর্গঠন
* সৌধের চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ
* আশপাশে অটোস্ট্যান্ড ও ময়লার ভাগাড় অপসারণ
* বেদখল হওয়া পুকুর পুনরুদ্ধার
* নান্দনিক পরিবেশ উন্নয়ন
* রাজনৈতিক প্রভাব ও বিজ্ঞাপনমুক্ত রাখা

শেষ কথা –

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন , এটি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, যা এখনো উপেক্ষিত। শহীদ সুধীর বড়ুয়ার স্মৃতিসৌধ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাস। এই ইতিহাস সংরক্ষণ করা শুধু স্থানীয়দের নয়, পুরো জাতির দায়িত্ব। যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে স্মৃতিসৌধটিকে তার প্রাপ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার এখনই সময়।

তথ্য ঋণঃ

এই প্রতিবেদন প্রণয়নে যাদের সাথে একাধিক সময়ে আলোচনা ও তথ্য সহায়তা নেওয়া হয়েছে—
১) আ. রহমান (বড়রিয়া)
২) তীলক রায়, পূর্বধলা প্রতিনিধি, ভোরের কাগজ
৩) প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক সুধীর দাস
৪) সাবেক সাংসদ ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল (বীর প্রতীক ১১ নম্বর সেক্টর )–এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত সৌধ পত্রিকা
৫) মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবু সাইদ আহমেদ খোকন ( কোম্পানী কমান্ডার- সালাউদ্দিন কোম্পানী, ১১ নম্বর সেক্টর)
৬) মরহুম অধ্যক্ষ জি. এম. হায়দার
৭) প্রয়াত শিক্ষক নৃপেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী
৮) বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আ. জব্বার
৯) মরহুম অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন
১০) মরহুম সৈয়দ সিদরাতুল মুনতাহা
১১) মরহুম সাংবাদিক জাফর তালুকদার
১২) রাজনৈতিক মরহুম নেতা ফকির হারুন আল হেলাল
১৩) মিজানুর রহমান বাবু, পরিচালক, গ্রীণ গিফট মানবসম্পদ উন্নয়ন বিদ্যালয়
১৪) রাজনৈতিক নেতা তপন রায়
১৫) তারুণ্য সাহিত্য সংসদ
১৬) মালঞ্চ
১৭) কবি ও সম্পাদক আশরাফ সরকার
১৮) অর্ণব সরকার, ক্ষেতমজুর নেতা

 

 

spot_img