দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী তরুণ নেতৃত্বকে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ওয়াশিংটন, ডিসি, ৩১ মার্চ ২০২৬: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতি জরুরি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণ সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ’ (আইএসডি) এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দ্য ভয়েস নিউজ’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল কনফারেন্সে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় (ইডিটি) অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে নীতি-নির্ধারক, বিশ্লেষক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইএসডি-র উপদেষ্টা সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, আইএসডি-র সভাপতি ও ভয়েস নিউজের সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর, আইএসডি-র সহ-সভাপতি ও ভয়েস নিউজের নির্বাহী সম্পাদক এজেডএম সাজ্জাদ হোসেন সবুজ, আইএসডি-র নির্বাহী পরিচালক ও ভয়েস নিউজের প্রধান ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শায়লা আহমেদ লোপা এবং আইএসডি-র পরিচালক ও ভয়েস নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক শাবান মাহমুদ।

তরুণ নেতৃত্ব এবং ঐতিহাসিক সচেতনতা
শেখ হাসিনা জাতীয় উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বাংলাদেশের যুবসমাজকে “বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল” হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাদেরকে নেতৃত্বদানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি ইতিহাসের সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। সম্মেলনে তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি সম্পর্কে সঠিক তথ্যে সমৃদ্ধ হতে হবে, যাতে তারা অপপ্রচার প্রতিরোধ করতে পারে এবং একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।”
২০২৪ সালের আগস্টের পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সৃষ্ট তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্যগুলো এসেছে। উল্লেখ্য যে, ওই পরিবর্তনের ফলে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠিত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থির অবনতি হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ব্যাপক অস্থিরতার খবর দিয়েছে, যার মধ্যে সহিংসতা এবং কথিত রাজনৈতিক প্রতিশোধ গ্রহণের মতো ঘটনাও রয়েছে।

মানবাধিকার ও আইনের শাসন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার পরিস্থিতির তথাকথিত অবনতি নিয়ে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, দেশি-বিদেশি কুশীলবদের মাধ্যমে সুগভীর ষড়যন্ত্রের ফলে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ হত্যা, নির্যাতন ও ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন।

স্বতন্ত্র মানবাধিকার সংস্থাগুলো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সহিংসতা তীব্রভাবে বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ৫ থেকে ৮ আগস্ট, ২০২৪-এর মধ্যে অন্তত ৩১৮ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২,০০০-এরও বেশি সহিংসতার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, “এই মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে হবে।” তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে নারী ও শিশুদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়াও তিনি পুলিশ সদস্যদের হত্যার জন্য জবাবদিহিতা দাবি করে বলেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তিনি তথাকথিত আইনের শাসনের ভেঙে পড়ার কঠোর সমালোচনা করেন এবং মব ভায়োলেন্স ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার চলমান প্রতিবেদনের দিকে ইঙ্গিত করেন।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সমালোচনা
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ করেন যে, এই প্রশাসন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি বলেন, “বিচার ব্যবস্থাকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে এবং এটি এখনো সংস্কারহীন রয়ে গেছে।” তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানান।
ঐক্য ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আহ্বান
তার সমাপনী বক্তব্যে শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো তরুণ নেতৃত্ব।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আইএসডি (ISD) সম্মেলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথের প্রতি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক মনোযোগের প্রতিফলন ঘটায়, বিশেষ করে যখন দেশটি শাসনব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী উত্তরণের একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর থেকে আইন বিশেষজ্ঞ এবং পর্যবেক্ষকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে সিভিল সার্ভিস ও বিচার বিভাগে বড় ধরনের রদবদলের খবর রয়েছে। বিভিন্ন ওয়াচডগ (তদারকি) সংস্থার মতে, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের গ্রেপ্তার এবং চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

spot_img