২০২৫ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যা, কারা হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বুধবার প্রকাশ করার কথা রয়েছে। এতে বলা হয়, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের মধ্যে আশা তৈরি হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও অবনতির দিকে গেছে।
মব সন্ত্রাসে ভয়াবহ চিত্র
২০২৫ সালে দেশে মব সন্ত্রাসে অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মব সন্ত্রাসে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল মিলিয়ে মোট ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন বলে আসক জানিয়েছে।
গত ৯ আগস্ট রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা মব সন্ত্রাসের ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভ্যানচোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় দুই নিরীহ মানুষকে। নিহতরা হলেন রুপলাল দাস (৪০) ও প্রদীপ দাস (৩৫)। একজন ছিলেন জুতা সেলাইয়ের কারিগর, অন্যজন ভ্যানচালক। মেয়ের বিয়ের দিন ঠিক করার উদ্দেশ্যে একসঙ্গে বের হলেও রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জ–কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে সন্দেহের বশে জনতা তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করে।
আসকের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি এবং পরিস্থিতি অবনতির মুখে পড়লে সেখান থেকে সরে যায়। এই নিষ্ক্রিয়তাই মব সন্ত্রাসকে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
আসকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি ২৭ জন মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন। এরপর গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে ৯, কুমিল্লায় ৮ জনসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু বেড়েছে
২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৬৯ জন ছিলেন হাজতি এবং ৩৮ জন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে—৩৮ জন।
১৪ জুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। কারা কর্তৃপক্ষ এটিকে আত্মহত্যা বললেও পরিবারের দাবি, তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা পাননি।
এছাড়া ২৯ সেপ্টেম্বর কারাবন্দি অবস্থায় সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের মৃত্যুও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মৃত্যুর পরও তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায় মরদেহ বহনের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত
২০২৫ সালে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে অন্তত ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬ জন যৌথ বাহিনীর হেফাজতে বা গুলিতে নিহত হন এবং ১২ জন থানায় বা হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ২১।
আসক বলছে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এখনও একটি চলমান সংকট।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় কোন্দল
২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন এবং নিহত হয়েছেন ১০২ জন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১০ জন, বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৩ জন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো দলীয় অভ্যন্তরীণ সহিংসতা। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরের কোন্দলে ১৯২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত এবং ২ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের জন্য বিপজ্জনক সময়
২০২৫ সালে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, বছরে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। মামলা হয়েছে ১২৩ জনের বিরুদ্ধে, সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন ১১৮ জন, প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন ২০ জন। তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং চারজনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার করা হয়েছে।
১৮ ডিসেম্বর রাজধানীতে দুটি শীর্ষ দৈনিকের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছে আসক।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা
২০২৫ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ঘরবাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা রয়েছে। একজন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, সংখ্যালঘুদের অধিকারকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা হয়নি এবং অধিকাংশ ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
‘সহনশীলতার সংকট’
আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর বলেন, মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সাংবাদিক নির্যাতন সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বলপ্রয়োগ এবং জবাবদিহির অভাব আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা আরও দুর্বল করেছে।
তিনি বলেন, নারীর চলাচল, পোশাক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক সমাজে সহনশীলতার সংকটকে স্পষ্ট করছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।
আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতির এই অবনতির ধারা অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

