অটোয়া/ঢাকা — বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতনের অভিযোগ কানাডার পার্লামেন্টে তুলেছেন দেশটির বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য মেলিসা ল্যান্টসম্যান। পরিস্থিতিকে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” আখ্যা দিয়ে তিনি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কানাডা সরকারের স্পষ্ট ও নীতিগত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
সম্প্রতি পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে মেলিসা ল্যান্টসম্যান বলেন, যুবনেতা শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে যে চরমপন্থী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বাড়িঘর ও মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা বেড়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, উগ্র স্লোগান দিয়ে সংগঠিত জনতা বিশেষ করে এমন সব সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যাদের ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই ধরনের বক্তব্য ও হামলা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ল্যান্টসম্যান বলেন, “বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি সংখ্যালঘুদের জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশটি ধর্মীয় সহিংসতার অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে।”
কানাডা সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবস্থানের আহ্বান
মেলিসা ল্যান্টসম্যানের মতে, এই পরিস্থিতিতে কানাডার নীরব থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, ধর্মীয় সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব রয়েছে এবং সেই দায়িত্ব পালনে কানাডার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
“মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে কানাডার অবস্থান সব সময়ই স্পষ্ট হওয়া উচিত। বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা নিয়ে আমাদের সরকারের সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া জরুরি,” বলেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার পার্লামেন্টে এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে—এমন সতর্কতা দীর্ঘদিন ধরেই দিয়ে আসছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতির পটভূমি
বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও হিন্দুরা দেশটির সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংখ্যালঘু। সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতার সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে।
বাংলাদেশ সরকার সাধারণত এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে। তবে সমালোচকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে উগ্র গোষ্ঠীগুলো আরও সাহস পেয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামলা, বাড়িঘর ও মন্দির ভাঙচুরের ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক গুরুত্ব
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আঞ্চলিক কূটনীতিতে বিষয়টি স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কানাডার মতো দেশের পার্লামেন্টে এ ইস্যু উত্থাপিত হওয়া ভবিষ্যতে বহুপাক্ষিক ফোরামে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে আলোচনার ইঙ্গিত দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়ার আশঙ্কা
বাংলাদেশ সরকার এখনো মেলিসা ল্যান্টসম্যানের বক্তব্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশের পার্লামেন্টে এ ধরনের আলোচনা সাধারণত আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়।
আসন্ন সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই মুহূর্তে বিষয়টি কানাডার পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক নথিতে স্থান পেয়েছে, যা বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

