আলেপ্পোতে নতুন সংঘর্ষ, মুখোমুখি কুর্দি ও সরকারি বাহিনী

সোমবার রাতে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা; নতুন সরকারের জন্য নতুন সংকটের ইঙ্গিত

সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোতে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আবারও অস্থির করে তুলেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে। সোমবার রাতে সরকারি বাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)–এর মধ্যে ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত একজন সেনা ও একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

এটি ছিল সিরিয়ার নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ। দশ মাস আগে ইসলামপন্থী বিদ্রোহীরা সাবেক শাসক বাশার আল–আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে দেশটির উত্তর–পূর্বাঞ্চল কুর্দি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আসেনি।

আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় ভয়াবহ লড়াই

রাতভর গুলিবর্ষণ ও মর্টার হামলার ঘটনা ঘটে আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত দুটি এলাকা—আশরাফিয়েহ ও শেখ মাকসুদে। এ দুটি এলাকাই বহু বছর ধরে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও সরকারি বাহিনীর মধ্যবর্তী সীমারেখা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, রাতভর গুলির শব্দ ও বিস্ফোরণে এলাকা কেঁপে ওঠে, আর আতঙ্কে শত শত মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে।

৬৩ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা সালাম বাহাদি বলেন, “মধ্যরাতে গুলির শব্দ শুরু হয়। একসময় দেখি এক ব্যক্তি রাস্তায় পড়ে আছেন, হাত ও পায়ে গুলি লেগেছে। তিনি আশরাফিয়েহ এলাকার কুর্দি বাসিন্দা। উদ্ধার করার মতো কেউ ছিল না, অ্যাম্বুলেন্সও আসতে পারেনি।”

সকাল নাগাদ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে জানা যায়, সংঘর্ষে কমপক্ষে দুজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

তড়িঘড়ি বৈঠক ও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা

সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার সকালে সিরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল মুরহাফ আবু কাসরা ও কুর্দি বাহিনীর প্রধান মাজলুম আবদি জরুরি বৈঠকে বসেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তর ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঘোষণা আসে।

আলেপ্পোর গভর্নর আজজাম আল–গারিব ফেসবুকে লিখেছেন, “সরকার কোনো সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে চায় না।” তবে আলেপ্পোর বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, এই সংঘর্ষ তাদের মনে পুরনো যুদ্ধের ভয় ফিরিয়ে এনেছে।

এক কুর্দি নারী, যিনি শেখ মাকসুদ এলাকায় থাকেন, বলেন, “রাতজুড়ে গুলির শব্দে ঘুমাতে পারিনি। সন্ধ্যায় আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিলাম, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে যায়।”

নতুন সরকারের জন্য নতুন সংকট

বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল–শারা, যিনি আসাদ পতনের পর ক্ষমতায় এসেছেন, শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জে পড়েছেন। বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় সহিংসতা সামলাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর সরকার আগেই সমালোচনার মুখে ছিল। এখন কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আল–শারার সরকার ও এসডিএফের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যাতে কুর্দি বাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার কথা ছিল। কিন্তু সেই চুক্তি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার বলছে, কুর্দিরা ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করছে; অন্যদিকে কুর্দি প্রশাসন অভিযোগ করছে, দামেস্ক সরকার তাদের প্রতিশ্রুত স্বায়ত্তশাসন দিচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। মার্কিন বিশেষ দূত থমাস জে. ব্যারাক জুনিয়র এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সোমবার এসডিএফ নেতা মাজলুম আবদির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং মঙ্গলবার দামেস্কে গিয়ে প্রেসিডেন্ট আল–শারার সঙ্গে বৈঠক করেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, কুর্দি ও সিরীয় সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ আবার ছড়িয়ে পড়লে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মতো উগ্র গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

এক আঞ্চলিক বিশ্লেষক বলেন, “এসডিএফ এখন দুই দিক থেকে চাপে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা, অন্যদিকে দামেস্কের নিয়ন্ত্রণে আসার চাপ। তারা কাকে বিশ্বাস করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।”

অস্থিরতা; অজানা আগামী

মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ আলেপ্পোর রাস্তাগুলোতে সেনা টহল বাড়ানো হয়। আপাতদৃষ্টিতে শান্তি ফিরে এলেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান। সরকার দাবি করছে, “সিরিয়ায় একাধিক সেনাবাহিনী থাকবে না,” আর কুর্দি প্রশাসন বলছে, “তারা আত্মসমর্পণ নয়, সমঝোতা চায়।”

১৩ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠনের পথে থাকা সিরিয়ার জন্য এই সংঘর্ষ একটি অশনি–সঙ্কেত। এক রাতের গোলাগুলি দেশটিকে মনে করিয়ে দিয়েছে—যুদ্ধ শেষ হলেও শান্তি এখনো খুব ভঙ্গুর।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles