ভোজ্যতেলের দাম আবারও বৃদ্ধি: ভোক্তাদের বোঝার উপর শাকের আঁটি

সরকার সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৯০ টাকা নির্ধারণ করেছে; ভোক্তাদের অভিযোগ—এটি রান্নাঘরের খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের দাম আবারও বেড়েছে। গতকাল সোমবার সরকার সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম আরও ১ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ভোক্তাদের কাছে এই সামান্য বাড়তিটুকুই বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে, কারণ প্রায় ৯ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির চাপে গৃহস্থালির বাজেট আগেই টানাটানির মধ্যে রয়েছে।

মানুষ একে ”বোঝার উপর শাকের আঁটি” বলছে। তবে ব্যবসায়ীরা লিটারপ্রতি ১০ টাকা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিল।

এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে সয়াবিন তেলের দাম দুই দফায় যথাক্রমে ৮ টাকা ও ১৪ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল।  এবার নতুন এই সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

ভোক্তারা প্রশ্ন তুলেছেন—যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তখন দেশে কেন বারবার দাম বাড়ানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১,২৪৫ ডলার, যা জুলাইয়ের তুলনায় কম। তবুও দেশের বাজারে ভোক্তারা বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন।

গৃহস্থালির কষ্ট আরও বাড়ছে

রান্নাঘরের অপরিহার্য উপাদান তেল—এর দামের সামান্য পরিবর্তনও সরাসরি প্রভাব ফেলে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খরচে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম হবে ১৯০ টাকা, যেখানে মার্চ মাসে তা নির্ধারিত ছিল ১৮৯ টাকা। অন্যদিকে, পাম তেলের দাম আগের মতোই ১৫০ টাকা থাকছে।

মিরপুরের গৃহিণী সেলিনা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে ভয়েসকে বলেন, “প্রতিমাসেই কিছু না কিছু বাদ দিতে হয়—মাছ, মাংস, ফল। এখন তেলও আমাদের চিন্তার কারণ হলো। এক টাকা শুনতে সামান্য মনে হলেও, মাসে কয়েক লিটার তেল কিনলে বোঝা অনেকটা বাড়ে।”

ধানমণ্ডির চাকরিজীবী রবিউল ইসলাম ভয়েসকে বলেন, “আমার বেতনের বেশিরভাগ চলে যায় বাসাভাড়া আর বাজারে। এখন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি—সব কিছুর বিল বাড়ছে। ভোজ্যতেলও যদি প্রতি কয়েক মাস অন্তর বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”

গাবতলীর বাসচালক আনোয়ার হোসেনের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন: “আমাদের পরিবার বড়। প্রতিদিন রান্নার জন্য অনেক তেল লাগে। ভর্তা, তরকারি, ভাজি—সবকিছুতেই তেল দরকার। এখন আর খাওয়াদাওয়ায় পুরনো স্বাদ রাখা যায় না, কমাতে হয়। বাচ্চারা বাজার থেকে কিছু চাইলে দিতে পারি না।”

সাম্প্রতিক মূল্য পরিবর্তনের হিসাব (আগস্ট ২০২৪–সেপ্টেম্বর ২০২৫)

তারিখ সিদ্ধান্ত সয়াবিন তেলের দাম (লিটারপ্রতি) পাম তেলের দাম (লিটারপ্রতি)
ডিসেম্বর ২০২৪ বৃদ্ধি Tk ১৬৭ → Tk ১৭৫ (+৮) Tk ১৪৯ → Tk ১৫৭ (+৮)
এপ্রিল ২০২৫ বৃদ্ধি Tk ১৭৫ → Tk ১৮৯ (+১৪) Tk ১৫৭ → Tk ১৬৯ (+১২)
আগস্ট ২০২৫ হ্রাস অপরিবর্তিত Tk ১৬৯ → Tk ১৫০ (–১৯)
সেপ্টেম্বর ২০২৫ বৃদ্ধি Tk ১৮৯ → Tk ১৯০ (+১) অপরিবর্তিত (Tk ১৫০)

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য পরিসেবার চাপ

ভোক্তাদের দুর্দশা শুধু ভোজ্যতেলের দামেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বেড়েছে।

  • গ্যাস ট্যারিফ: ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাসের দাম প্রায় ৩৩% বাড়ানো হয়—Tk ৩০ থেকে Tk ৪০ প্রতি ঘনমিটার।
  • বিদ্যুৎ: ২০২৫ সালের জুন, অক্টোবর ও ডিসেম্বর—এই তিন ধাপে বিদ্যুতের ট্যারিফ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্প ও গৃহস্থালি উভয়ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে।

মোহাম্মদপুরের এক দোকানদার মো. শফিকুল ইসলাম ভয়েসকে বলেন, “একদিকে বিদ্যুতের বিল, অন্যদিকে গ্যাসের দাম—সব বাড়ছে। দোকানের খরচ সামলাতে গিয়ে পণ্যের দামও বাড়াতে হচ্ছে। এতে ক্রেতারা কমে যাচ্ছে, ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

ভোক্তাদের ক্ষোভ

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেছেন, “এমনকি ১ টাকার বৃদ্ধি হলেও তা ভোক্তাদের জন্য খারাপ খবর। সরকার ব্যবসায়ীদের চাপে নত হয়েছে। এটি অরাজনৈতিক সরকারের জন্য এক ধরনের পরাজয়।”

আস্থা সংকটে সাধারণ মানুষ

দিনমজুর, নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই এখন ভোগ্যপণ্যের দামে হাঁপিয়ে উঠেছে। রান্নাঘরের খরচই যখন সামলানো দুষ্কর, তখন প্রতিটি টাকার বৃদ্ধি আস্থার সংকট তৈরি করছে।

কুমিল্লা থেকে আসা মাহফুজা খাতুন নামের এক ভদ্রমহিলা আক্ষেপ করে বললেন, “আগে মাসে একবার বড় বাজার করতাম। এখন সপ্তাহে সপ্তাহে সামঞ্জস্য করতে হয়। তেলের দাম বাড়লে বাজার তালিকাই বদলে যায়। আমাদের জীবনটা এখন পুরোপুরি হিসাব-নিকাশের খাতা হয়ে গেছে।”

ভোজ্যতেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণ করে, সংকটে পড়লে ভোক্তারাই সবসময় প্রথমে চাপ সামলায়। আর এই বাস্তবতাই সাধারণ মানুষকে সরকারের নীতির প্রতি আরও সন্দিহান করে তুলছে।

spot_img