বিদেশী শ্রমবাজারে বাংলাদেশিরা যেতে পারছে না; প্রবাসী আয়ের সম্ভাবনায় ক্ষয়

আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনসহ একাধিক দেশ বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা ও প্রবেশ সীমিত করেছে। এতে প্রবাসী আয় অনিশ্চয়তায়; বিশেষজ্ঞরা দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রবাসী শ্রমবাজার এখন বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে।

সরকার ও কূটনৈতিক মহল থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ফলে কোটি কোটি পরিবার নির্ভরশীল বৈদেশিক আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ইউএই: দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল ইউএই। তবে ২০১৩ সাল থেকে বাজারটি মূলত বন্ধ। কয়েক বছর বিরতির পর ২০২১ সালে কিছুটা অগ্রগতি হলেও ২০২২ সালে প্রায় এক লাখ কর্মী গিয়েছিলেন, ২০২৩ সালেও প্রায় সমান সংখ্যক। কিন্তু গত বছর সংখ্যাটি নেমে আসে অর্ধেকে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রবাসীদের সংহতি প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউএই বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন চুপিসারে সীমিত করে। দুবাইতে বাংলাদেশের সাবেক কনসাল জেনারেল বিএম জামাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ বছরের ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিটে সরাসরি ইউএই মন্ত্রীদের কাছে বাজার খোলার অনুরোধ করেন। কিন্তু এতদিনেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

বিদেশ যেতে ইচ্ছুক রংপুরের দিদারুল আলম ভয়েসকে বলেন, “১৩ মাস হলো পাসপোর্ট জমা দিয়েছি। ভিসা প্রক্রিয়া এখনও আটকে আছে।”

অন্যদিকে এক অনলাইন ওয়েবসাইট সম্প্রতি দাবি করে যে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া হবে না। ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সেই খবর অস্বীকার করলেও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, “গত এক বছরে কোনো ভিসা না দেওয়া মানেই কার্যত নিষেধাজ্ঞাই বহাল আছে।”

মালয়েশিয়া: প্রতিশ্রুতি, কিন্তু ফল নেই

২০২১ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ কর্মী সেখানে যান। কিন্তু প্রায় ১৮ হাজার কর্মী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্রমণ করতে না পেরে আটকে যান।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের গত বছরের ঢাকা সফরসহ একাধিক বৈঠক ও আলোচনার পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। এ বছরের মে মাসে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরে বৈঠক হয়, যেখানে অগ্রাধিকারের আশ্বাস মিললেও কোনো বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

কুষ্টিয়ার মোতালেব হোসেন বলেন, “মালয়েশিয়ায় চাকরি পাওয়ার জন্য আমি দালাল ও এজেন্সিকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি। এখন সরকার যদি কেবল ৭৯,৯০০ টাকা ফেরত দেয়, আমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।”

অন্যান্য দেশেও সংকট

ইউএই ও মালয়েশিয়ার পাশাপাশি ওমান, বাহরাইন, মালদ্বীপসহ আরও কয়েকটি দেশ বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দিয়েছে। বাহরাইনে ২০১৮ সালে এক বাংলাদেশির হাতে ইমাম খুন হওয়ার পর দেশটি বাজার বন্ধ করে দেয়। ওমান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অতিরিক্ত শ্রমিক ও ভিসাজনিত সমস্যার কারণ দেখিয়ে প্রবেশ বন্ধ করে। মালদ্বীপও গত বছর অনিয়মের অভিযোগে ভিসা স্থগিত করে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “আমাদের শ্রমবাজার দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। প্রতারণা, ভিসা ট্রেডিং, অতিরিক্ত নিয়োগ আর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ পুরো ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে।”

তিনি সতর্ক করেন, সৌদি আরবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। “শ্রমবাজারে প্রতিযোগী দেশ ফিলিপাইন আর নেপাল সুযোগ নিচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত সংস্কার না করি, টিকে থাকা কঠিন হবে।”

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)-এর সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ফখরুল ইসলাম মনে করেন, প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কূটনীতিতে কার্যকর হচ্ছে না কেন আমরা জানি না। “তিনি সরাসরি উদ্যোগ নিলে কিছু বাজার খোলার সম্ভাবনা থাকার কথা,” বলেন তিনি।

রেমিট্যান্স ঝুঁকিতে

প্রতি বছর ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে প্রবাসীদের পাঠানো টাকায়। বাজার সংকোচনের কারণে শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিও মারাত্মক চাপে পড়ছে।

বর্তমান বাস্তবতা বলছে—সিন্ডিকেট ভাঙা, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা, কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রবাসী আয়ের এই ভরসা ভেঙে পড়তে পারে যে কোনো সময়।

spot_img