বাংলাদেশি আলেমদের সফর: কাবুল থেকে ঢাকায় উগ্র মতাদর্শের নতুন স্রোত?

মামুনুল হকের নেতৃত্বে আলেমদের এই আফগান সফর বাংলাদেশে তালেবানী উত্থানের নতুন সংকেত মনে করা হচ্ছে।

ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ইসলামি আলেম তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে সফরে গিয়েছেন। বাংলাদেশের খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের প্রতিনিধিদলটি কাবুলে তালেবান সরকারের আমন্ত্রণে পৌঁছেছে।

তারা তালেবানের প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং আফগানিস্তানে মানবাধিকার ও নারী অধিকার পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখবেন বলে মিডিয়াকে জানানো হয়েছে।

সফরটি এমন সময়ে হচ্ছে যখন বাংলাদেশে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী প্রবণতার পুনরুত্থান ও সম্ভাব্য “ইসলামী বিপ্লব” বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশ্লেষকদের মতে, তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানে স্থানীয় আলেমদের এই সফর দেশে ইসলামপন্থী মতাদর্শের সম্প্রসারণকে আরও উৎসাহিত করতে পারে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রকাশ্য সফরের পেছনের কাহিনি ও উদ্দেশ্য

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে প্রতিনিধি দলটি দুবাই হয়ে কাবুলে পৌঁছায়। দলটির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও মধুপুরের পীর মাওলানা আবদুল হামিদ, মাওলানা আবদুল আউয়াল, মাওলানা আবদুল হক, হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী, মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী ও মাওলানা মাহবুবুর রহমান।

খেলাফত মজলিসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পাঁচ দিনের সফরে তাঁরা আফগান প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, শীর্ষ আলেম ও তালেবান প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনার জবাবে আফগানিস্তানে নারী অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সরেজমিন মূল্যায়ন করবেন বলেও জানানো হয়। সফরসূচিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, বরং ২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখলের পর ঢাকা একটি সতর্ক বিবৃতিতে বলেছিল “আফগান জনগণের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় শাসনব্যবস্থাই সে দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের সর্বোত্তম গ্যারান্টি”—যা পরোক্ষভাবে তালেবানের একচ্ছত্র ইসলামি শাসনের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করে।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় বেসরকারি পর্যায়ে দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে। খেলাফত মজলিসের এই সফরকে যদিও দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ “শুধু ওলামাদের দ্বীনী সফর, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়” বলে বর্ণনা করেছেন, তারপরও তিনি স্বীকার করেছেন যে মামুনুল হক দ্বৈত ভূমিকা পালন করছেন – একদিকে বড় আলেম, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের আমির।

দলীয় বিবৃতিও কার্যত একে এক ধরনের কূটনৈতিক মিশন হিসেবে তুলে ধরেছে, যেখানে “দুই দেশের ইসলামী স্কলারদের মাঝে সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও শিক্ষায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নারী ও মানবাধিকার বিষয়ে পশ্চিমা সমালোচনা কতটা সত্য তা পর্যবেক্ষণ” করার কথা উল্লেখ আছে।

সংগঠনের নেতারা বলছেন, “গৃহে নারীকে রাখা মানেই তাদের অধিকার হরণ কি না – এসব বিষয়ে পশ্চিমাদের ধারণা সঠিক কি না, তা নিজের চোখে দেখতে গেছেন”। এটা স্পষ্ট যে তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই সফরটি ব্যবহৃত হতে পারে।

সফরটির সময়সূচি নিয়েও দেশে আলোচনা চলছে। ঠিক যখন মামুনুল হক কাবুলে তালেবান নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে ব্যস্ত, একই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক দল খেলাফত মজলিস বাংলাদেশে বড় বড় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করছে। রাজধানী ঢাকায় ১৮ সেপ্টেম্বর দলটি “জুলাই সনদ” বাস্তবায়ন, ইসলামী শাসন ও সংবিধান সংস্কারের দাবিতে বিশাল মিছিল করে প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সময়সূচি “অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং নজরকাড়া”, কারণ এতে মনে হচ্ছে আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে সখ্য দেখিয়ে একইসঙ্গে দেশের ভেতরে ইসলামপন্থী দাবিগুলোর পক্ষেকে জোরদার করা হচ্ছে।

ঢাকার এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিবিসির কাছে মন্তব্য করেছেন, “তিনি (মামুনুল) যখন বিদেশে, তাঁর দল দেশে রাস্তায় – এটা স্রেফ তীর্থযাত্রা নয়, বরং রাজনৈতিক মঞ্চায়ন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংযোগের ইঙ্গিত”।

অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের নেতারা দাবি করছেন তাদের এই সফরের মাধ্যমে কোনো “তালেবান-পন্থী রাজনৈতিক আঁতাত” হচ্ছে না। তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশি আলেমদের কাবুল যাত্রা আসলে প্রকাশ্যে তালেবান সরকারের প্রতি এক ধরনের সংহতি প্রকাশ এবং দেশের ভেতর তালেবান-মতো ইসলামি শাসনের আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ-আফগান জিহাদ সংযোগ

বাংলাদেশ থেকে আফগানিস্তানের জিহাদে যোগ দেওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধে অংশ নিতে বহু বাংলাদেশি যুবক পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে যান।

সোভিয়েত সেনাদের বিরুদ্ধে মুজাহিদীনদের সাথে লড়াই করে অভিজ্ঞ এসব যোদ্ধা দেশে ফিরে গিয়ে হরকতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি)’র মতো জঙ্গি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০-এর দশকে আফগান যুদ্ধফেরত এসব “আফগান ফেরত” যোদ্ধারা বাংলাদেশকে শরিয়া আইনে পরিচালিত “খাঁটি ইসলামি রাষ্ট্র” বানানোর উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন।

২০০১ সালে তালেবানদের প্রথম শাসনামল চলাকালীনও বাংলাদেশ থেকে একটি বেসরকারি ওলামা প্রতিনিধিদল আফগানিস্তান গিয়েছিল বলে জানা যায়। জাগো নিউজের তথ্যমতে, ২০০১ সালের সেই সফরে অংশ নেওয়া আলেমদের কেউই আজ জীবিত নেই। তবে দুই দশক পর ২০২১ সালে তালেবান ফের আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করলে বাংলাদেশের কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মাঝে আবার উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়ের সময়টিতে বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় আফগান তালেবান ও বাংলাদেশের হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর ব্যাপারে সমালোচনা মূলক মন্তব্য করতে অনেককেই দেখা গেছে।

তবে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার সাহস ও সামর্থ্য কেউ পাচ্ছে না। এ বিষয়ে মুখ খুলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হয়ে গেছে।

আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয়ে বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের যে মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বিভিন্ন ঘটনা ও তৎকালীন অনেকের মন্তব্যে প্রতিফলিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আলী রীয়াজ, যিনি বর্তমানে মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক নিয়োজিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এর আগে বলেছিলেন, “তালেবানের বিজয় তাদের আদর্শের অনুসারীদের নিঃসন্দেহে উদ্দীপ্ত করবে” (news.illinoisstate.edu)

বাস্তবেও দেখা গেছে, ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল দখলের পরপরই বাংলাদেশের জঙ্গি ও চরমপন্থী মহলে উচ্ছাসের ঢেউ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে “মুরতাদ সরকার” (ধর্মত্যাগী সরকার, ইঙ্গিত শেখ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ সরকার) উচ্ছেদ করে আফগান তালেবানের মতো সংগ্রামের” আহ্বান জানায় (thediplomat.com)

একাধিক ফেসবুক পোস্টে সরাসরি “তালেবান-ধাঁচের লড়াইয়ের মাধ্যমে ঢাকা দখলের” ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, গ্রেপ্তার হওয়া হেফাজত নেতা-কর্মীরা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে তারা সরকার পতন করে আফগানিস্তানের তালেবানের আদলে বাংলাদেশে ইসলামিক শাসন কায়েমের পরিকল্পনা করেছিলেন (swarajyamag.com)

ওই পুলিশ কর্মকর্তার মতে, বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতা ও জামায়াত-সম্পৃক্ত ব্যক্তি পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়বা (LeT) জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত থেকে বিদেশি অর্থায়নে সহিংস আন্দোলন চালিয়েছে। ২০২১ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের বিরোধিতায় হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের পর এসব তথ্য উঠে আসে। দৃশ্যত, বাংলাদেশকে “দ্বিতীয় আফগানিস্তান” বানানোর সুস্পষ্ট অভিসন্ধি নিয়ে কিছু চরমপন্থী গোপনে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে গোঁড়া ইসলামী আন্দোলনগুলোর আদর্শিক লক্ষ্য তালেবানের সঙ্গে বহু বিষয়ে মেলে। বিশ্লেষকরা হেফাজতে ইসলামকে বাংলাদেশের “ঘরের তালেবান” বলেও অভিহিত করে থাকেন। কারণ হেফাজত নেতারা তালেবানের মতোই নারীর আধিকার ও স্বাধীনতার বিপক্ষে, ভাস্কর্য ও মূর্তিকে “শিরক” আখ্যা দিয়ে ধ্বংসের দাবি তুলে এবং একমাত্র ইসলামী শরিয়াতেই রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখেন।

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম যখন তাদের ১৩-দফা দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করেছিল, তরুণ প্রজন্মের প্রগতিশীল গোষ্ঠী গণজাগরণ মঞ্চ তার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বলে, “নতুন প্রজন্ম চুপ করে থাকবে না… বাংলাদেশকে তালেবানী রাষ্ট্র বানানোর যেকোনো চেষ্টা তারা লাঠি হাতে রুখবে”। সেটি ছিল এক সামাজিক প্রতিরোধের ইঙ্গিত।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর সরকারের কঠোর অভিযানে জঙ্গি নেটওয়ার্ক কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, তালেবানদের আফগান পুনরুত্থান বাংলাদেশে সুপ্ত মৌলবাদী চেতনায় নতুন প্রেরণা দিয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান একইভাবে মন্তব্য করেন আফগানিস্তানের পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে এবং “উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে”। অর্থাৎ, আফগান তালেবানদের প্রত্যাবর্তন অনেক বাংলাদেশি উগ্রপন্থীর কাছে আদর্শগত বিজয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: কী বলছেন বিশ্লেষকরা?

বাংলাদেশি আলেমদের আফগানিস্তান সফরটি দেশীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজর এড়ায়নি। খোলামেলা এই যোগাযোগকে তাঁরা দ্বিমুখী উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন। একদিকে তালেবান সরকার ধর্মীয় কূটনীতির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামপন্থীদের আপন শিবিরে টানছে; অন্যদিকে বাংলাদেশের মাটিতে এসব ইসলামপন্থী নেতার তৎপরতা উগ্রবাদীদের অক্সিজেন জোগাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তালেবান সরকার বিশ্বমঞ্চে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে এ ধরনের সফরের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর জনমত পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। জার্মান মার্শাল ফান্ডের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো তালেবানকে স্বীকৃতি না দিলেও কিছু মুসলিম রাষ্ট্র ও সংগঠন “ধর্মীয় কূটনীতি” চালিয়ে তালেবানের সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে এবং তাদের শাসনের পক্ষে সাফাই গাওয়ার লোক জোগাড় করছে।

বাংলাদেশের এই প্রতিনিধি দল তালেবানের আমন্ত্রণে তাদের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখে এসে দেশে সে সম্পর্কে ইতিবাচক বক্তব্য দিলে তালেবানদেরই লাভ। যেমন ইতিমধ্যে খেলাফত মজলিস নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আফগানিস্তানে পশ্চিমা গণমাধ্যমের বর্ণনার মতো নারী অধিকার লঙ্ঘন হয় কিনা তা তারা “নিজের চোখে দেখে” এসে জানাবেন। এটি মূলত তালেবানদের পক্ষে জনমত তৈরিরই অংশ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এ সফর আরও বেশি উদ্বেগজনক। পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, তালেবান শাসনের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার ফলে বাংলাদেশের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নবপ্রাণ পেতে পারে।

ইতিমধ্যে গত এক বছরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিরোধী অবস্থানে নরমভাব দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে “জিরো টলারেন্স” নীতির জায়গায় এক ধরনের শৈথিল্য এসে গেছে, যা সন্ত্রাসীরা পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। আগের সরকারের জঙ্গি দমনে অভিযুক্ত অনেক শীর্ষ জঙ্গি আদালত থেকে রহস্যজনকভাবে জামিনে মুক্তি পেয়েছে, কারো কারো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজাও জামিনে ঝুলে গেছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন – কীভাবে একের পর এক চরমপন্থী দাগী আসামি এত সহজে মুক্ত হতে পারে?

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সূত্রে দ্য ডিপ্লোম্যাট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে প্রভাবশালী কিছু মহল ইচ্ছাকৃতভাবে জঙ্গিদের মুক্তির ব্যবস্থা করছেন বা অন্তত বাধা দিচ্ছেন না (thediplomat.com)। এমনকি অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার একজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ হিযবুত তহরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে, যা দেখিয়ে দেয় যে এ নরমনীতি কেবল অবহেলা নয়, বরং সচেতন রণকৌশলও হতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, উগ্রবাদ এখন সরাসরি সন্ত্রাসী হামলার বদলে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে ওলট-পালট ঢোকার কৌশল নিয়েছে। ঢাকায় ২০১৬ সালের ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় সন্ত্রাসী হামলা না থাকায় অনেকের কাছে পরিস্থিতি শান্ত মনে হতে পারে। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, এটা আসলে “নীরব অনুপ্রবেশ” – যেখানে জঙ্গিরা বোমা-গুলি না চালিয়ে রাজনীতির ক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে তাদের চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়াচ্ছে।

বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চরমপন্থীরা এখন সরাসরি হামলার পরিবর্তে রাজনৈতিক দল গঠন, আন্দোলন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি অর্জনের পথ নিচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবান বিজয় এই কৌশলকে ত্বরান্বিত করেছে বলেই মনে করেন অনেকে। যেমন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সক্রিয় তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) এবং আল-কায়েদার সঙ্গে কিছু বাংলাদেশি জঙ্গির যোগাযোগের তথ্য সম্প্রতি উঠে এসেছে।

২০২৩ এর আগস্টে গ্রেফতার হওয়া জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়ার নেতা শামীম মাহফুজের কাছে টিটিপি ও আল-কায়েদার সংযোগ পাওয়া যায়, আর আরেক চরমপন্থী আসিফ আদনানের নাম টিটিপির হয়ে “জিহাদের প্রস্তুতি” মামলায় উঠে আসে। ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও আদর্শগতভাবে তালেবান ও দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর মধ্যে যে সেতুবন্ধ, তা এ ধরনের সফর ও যোগাযোগ আরও মজবুত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মহলে উদ্বেগ, বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের এই উত্থান ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি আলেমদের এই সফর পশ্চিমা মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোকেও উৎকণ্ঠিত করেছে, কারণ এতে মনে হতে পারে বাংলাদেশে তালেবান শাসনের প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও “সামরিক-ইসলামপন্থী” অন্তর্বর্তী সরকার

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এই পুরো ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৪ সালের আগস্টে ইসলামপন্থীদের সক্রিয় মদদে সংঘঠিত ছাত্র আন্দোলন ও সহিংসতার মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হলে সেনাবাহিনীর সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের পূর্ণ সমর্থনে এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই ইসলামী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যে দলগুলো চাপে ছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম হঠাৎ করেই নতুন সুযোগ পেয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। দশকের পর দশক বিতর্কিত এই ইসলামপন্থী দলটি যুদ্ধাপরাধের বিচারের কারণে রাজনীতি থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু এখন তারা প্রকাশ্যে সমাবেশ করা তো বটেই, ইউনুস সরকারের মধ্যে প্রভাবশালী এবং আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হয়ে তাদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে। ১৯ জুলাই ২০২৫ ঢাকায় জামায়াতে ইসলামী একটি বিশাল জনসমাবেশ করেছে।

সরকার পরিবর্তনের পরই হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক সহ বহু কারাবন্দী আলেম জামিনে মুক্তি পান বা মামলায় খালাস হতে শুরু করেন। ২০২১ সালের হেফাজত তাণ্ডবের পর মামুনুল হকের বিরুদ্ধে হওয়া একটি ধর্ষণ মামলায় আশ্চর্যজনকভাবে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান। নতুন সরকার চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে সমন্বয়মূলক নীতি নিয়েছে, যাতে ধর্মীয় শক্তিগুলোকে আপসে নিয়ে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যায়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয় মো. নাসিমুল গনীকে, যিনি অতীতে নিষিদ্ধ হিযবুত তহরীরের বাংলাদেশ শাখার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। একইভাবে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ পরামর্শক এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে মো. মাহফুজুল আলম নামে একজন কট্টর ইসলামপন্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ইসলামপন্থীরা এখন “জুলাই সনদ” নামের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। তাদের প্রস্তাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি বন্ধ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবিলম্বে ইসলাম শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, এবং সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাসহ কিছু মূলনীতির পুনর্বিবেচনা করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৮ সেপ্টেম্বর খেলাফত মজলিসের সমাবেশে দলের সেক্রেটারি জেনারেল আহমদ আবদুল কাদের অভিযোগ করেন, সরকার প্রাথমিক স্কুলে সংগীত ও চারুকলার শিক্ষক নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করেছে কিন্তু বহুদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেয়নি, যা “জনগণের বৃহত্তর অংশকে অসন্তুষ্ট করেছে”।

জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ সাতটি ইসলামি দল গতকাল রাজধানীতে পৃথক মিছিল করে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে মামুনুল হকদের আফগানিস্তান সফরকে কেউ কেউ বাংলাদেশে একটি “ইসলামী অন্তর্বর্তী জোট” তৈরির বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবেও দেখছেন। আন্তর্জাতিক সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (আইসিপিএস)-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ার লক্ষ্যে ঢাকায় গোপন বৈঠক করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে (icpsnet.org)। ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও বাংলাদেশে তালেবানপন্থী ধারা উত্থান লাভের পথে আছে।

spot_img