ঢাকা/রাজশাহী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মাহিনকে দফায় দফায় মারধরের ঘটনায় রাকসুর (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) এস এম সালমান সাব্বিরসহ রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নয় নেতার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। মামলায় আরও ১৭ থেকে ১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজশাহী জেলার মতিহার থানা আমলি আদালতে মাহিনের বাবা এম. এস. আজাদ উজ জামান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে আদালত তাৎক্ষণিক কোনো আদেশ না দিয়ে তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হযরত আলী সাংবাদিকদের বলেন, “আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিক কোনো আদেশ দেননি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে পাঠানো হয়েছে।”
যাদের বিরুদ্ধে মামলা
মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে। এছাড়া এজিএস এস এম সালমান সাব্বির, রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব, তথ্য ও গবেষণা উপ-সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম, শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসান উল্লাহ ফারহান, নবাব আব্দুল লতিফ হল সংসদের জিএস নুরুল ইসলাম শহীদ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মেহেদী সজীব এবং ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজাকে আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া আরও ১৭ থেকে ১৮ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে যেসব অভিযোগ
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২৭ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মাহমুদুল হাসান মাহিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে অবস্থান করছিলেন। এ সময় ১৯ থেকে ২০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র, লোহার রড, বেত ও বাঁশের লাঠি নিয়ে তাকে ঘিরে ধরে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়।
অভিযোগে বলা হয়, প্রধান আসামি সালাহউদ্দিন আম্মার লোহার রড দিয়ে মাহিনের মাথা ও কপালে একাধিকবার আঘাত করেন। পরে অন্য আসামিরাও লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে গুরুতর জখম করেন।
এজাহার অনুযায়ী, একপর্যায়ে হামলাকারীদের কয়েকজন মাহিনকে মাটিতে ফেলে তার বুক ও গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় লোকজন ও স্বেচ্ছাসেবীরা তাকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পরও হামলাকারীরা সেখান থেকে নামিয়ে আবারও তাকে মারধর করে। বাদীর দাবি, তাকে একাধিক দফায় হত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হলেও অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার পরদিন মাহিনের বাবা মতিহার থানায় মামলা করতে গেলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রতিকার নেওয়ার পরামর্শ দেন।
মাহিনের বাবা এম. এস. আজাদ উজ জামান সাংবাদিকদের বলেন, “ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফেসবুকের মাধ্যমে হামলার বিষয়টি জানতে পারি। পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখি।”
তিনি আরও বলেন, “পরদিন মতিহার থানায় মামলা করতে গেলে ওসি মামলা নেননি। পরে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে মামলা দায়ের করেছি।”
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মতিহার থানা পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পটভূমি
গত সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত ওই ঘটনায় মাহমুদুল হাসান মাহিনসহ তিন শিক্ষার্থী দফায় দফায় হামলার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি মাহিনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তুললেও, সেখান থেকে তাকে নামিয়ে আরও কয়েক দফা মারধর করা হয়।
পরবর্তীতে মাহমুদুল হাসান মাহিন এবং আরেক শিক্ষার্থী আনাস আহমেদকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নগরীর শাহ মখদুম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া আগের একটি মামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।
তদন্ত করবে পিবিআই
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এখন মামলার অভিযোগগুলো তদন্ত করবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে সংস্থাটি আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।


