‘জুলাই ঘোষণা’র প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

অন্তর্বর্তী সরকারের 'জুলাই ঘোষণা' ঘিরে মতবিরোধ, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ

ঢাকা, ৪ আগস্ট ২০২৫ — ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারকে অপসারণের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার আগামীকাল ঘোষণা করতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘জুলাই ঘোষণা’, যা নিয়ে বিতর্ক, অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা প্রবল।

ঢাকায় একটি মহা সমাবেশে ঘোষণাপত্রটি উন্মোচন করা হবে। তবে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিরাজমান দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন—এটি সত্যিকারের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে, না কি কেবল নতুন শাসনের বাহারি মোড়ক।

আশাবাদ থেকে আশঙ্কা

বিশেষ কোটা বাতিলের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী একটি বিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল। ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে বিক্ষোভকারীরা ঢুকে পড়লে তিনি হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন। এরপর সেনাবাহিনীর সমর্থনে ৮ আগস্ট ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

তৎকালীন প্রতিশ্রুতি ছিল—দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, সংস্কার ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। প্রথমদিকে জনমনে ছিল আশা ও উদ্দীপনা। কিন্তু এক বছর পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।

শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের মুহুর্ত থেকেই দেশব্যাপি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ও ভাষ্কর্যসমূহ ধ্বংস করা শুরু হয়। ছয় মাস পর সরকারি বাহিনীর উপস্থিতিতে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীকার আন্দোলনের অন্যতম সুতিকাগার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়িটি ধবংস করা হয়। সালাফি ইসলামে বিশ্বাসীরা সরকারের দৃশ্যমান প্রশ্রয়ে সারাদেশে শত শত মাজারে হামলা ও ধ্বংস সাধন করা করেছে।

কথিত জুলাই বিপ্লবের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ ও অপরাধ কর্মের বিচার বন্ধের জন্য সরকার আদেশ জারি করে। কালক্রমে সারাদেশে জুলাই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী ও অন্যান্য অপরাধের ব্যপকতা সমাজের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে।

ইউনুস সরকারের সমর্থকরা সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দখল করে নেয়। ভিন্নমতের প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সংবাদ প্রচারের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নতুন সরকার মারাত্মক দমনমূলক কৌশল গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থক ও সমমনাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট, ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রচুর মানুষকে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের লক্ষ্য করে হামলা, ধরপাকড় ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সরকার ও সরকার সমর্থক মবের যৌথ অভিযান নিয়মিত চলছে।

সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপরও হামলা অব্যাহত আছে। সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচাড়ায় একটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে হামলা করে ২০টি হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের সবকিছু লুটপাট করা হয়েছে।

আদালত চত্বরে পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় গ্রেফতারকৃত নেতাদের বিচারাধীন অবস্থায় হামলার শিকার হতে হচ্ছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, “আইনের শাসন ধ্বংসের মুখে।”

ব্যাপক ধরপাকড় ও বিরোধী দমন

ইউনূস সরকার গত মে ২০২৫-এ “সন্ত্রাসবিরোধী আইন” সংশোধনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে ৯২,০০০-এর বেশি ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়। কয়েক শত নেতা, মন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে অভিহিত করেছে।

অন্যদিকে, নিরাপত্তা বাহিনী ও ইউনূস সমর্থক ইসলামপন্থীদের সহিংসতার দায় নিরূপণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে অভিযানে ১৩০০-এর বেশি লোককে আটক করা হয়, যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো প্রথমদিকে সংস্কারকে স্বাগত জানালেও সাম্প্রতিক দমনমূলক পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ একে “ইউনূসের প্রতিহিংসার রাজনীতি” বলে অভিহিত করেছেন।

অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও বন্যার পরে পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকদের ধর্মঘট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে জনগণের ক্ষোভ বেড়েছে।

‘জুলাই ঘোষণা’: আশার আলো না ছলনা?

‘জুলাই ঘোষণা’ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। ২৬ দফা ভিত্তিক এই খসড়া সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে বিতর্ক চলছে একে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। ইউনূসপন্থী ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) চায় একে “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” ঘোষণার মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করতে। বিপরীতে, বিএনপি এর ঘোর বিরোধিতা করছে—তারা একে “রাজনৈতিক দলিল” হিসেবে সংরক্ষণে আগ্রহী, সংবিধানে নয়।

বিএনপি সন্দেহ করছে, সরকার এটি ব্যবহার করে আরও ক্ষমতা দখল কিংবা অন্তর্বর্তী শাসন দীর্ঘায়িত করতে পারে। ঘোষণাটি প্রকাশে বিলম্ব ও গোপনীয়তা এসব শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সেনাবাহিনীর চাপ ও নির্বাচন অনিশ্চয়তা

সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখনো গভীর ও রহস্যময়। সেনাপ্রধান ওয়াকfর-উজ-জামান প্রকাশ্যে বলছেন—২০২৫ সালের মধ্যেই নির্বাচন হতে হবে। অথচ ইউনূস সরকার নির্বাচন ঘোষণা করেছে ২০২৬ সালের এপ্রিলের জন্য।

বিএনপি ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যেই নির্বাচন দাবি করছে। বিপরীতে, এনসিপি ও ইসলামপন্থী দলগুলো বলছে, “সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে বিপ্লব ব্যর্থ হবে।”

বৃহৎ দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন?

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন আয়োজন করলে তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—এই প্রশ্ন উঠছে। দলটি দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের বাদ দিলে নির্বাচনে বহুমত ও অংশগ্রহণ হুমকির মুখে পড়ে।

আইনজ্ঞ তকবির হুদা বলেন, “গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বহুমতের উপস্থিতি ও ন্যায়বিচার প্রয়োজন।”

সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

কথিত ‘জুলাই বিপ্লব’-এর এক বছর পর বাংলাদেশ আজ একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। ‘জুলাই ঘোষণা’ সত্যিই যদি গণতন্ত্রের পথ দেখায়—তবে সেটি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক।

নাহলে, একনায়কত্বের ছায়া থেকে মুক্তি নয়—বরং নতুন এক কর্তৃত্ববাদে বন্দী হবে ‘নতুন বাংলাদেশ’।

spot_img
spot_imgspot_img