সিয়াম পারভেজ, রংপুর
গত ২৬ ও ২৭ জুলাই দুই দিনে দুই দফায় হামলা করা হয়েছে। তার আগে হামলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং হামলার ছক সাজানো হয়েছিল। হামলার জন্য উস্কানি দিয়ে তৌহিদি জনতাকে জরো করতে মসজিদের মাইক ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে লোক নিয়ে আসা হয়েছিল। ফেসবুকে ইসলামের নবীর নামে কটুক্তি থেকে শুরু করে মব সংগঠিত করে হামলা করা পর্যন্ত সবটাই ছিল পরিকল্পিত।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত ছয়আনি পাড়ায় হামলার শিকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, প্রত্যক্ষ্যদর্শী, স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, পুলিশ ও পরিদর্শনকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সাথে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।
ইসলামের নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-কে নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টের অভিযোগ তুলে মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজারো লোক ঐ গ্রামের সকল হিন্দু পরিবারের উপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি মূল্যবান সামগ্রী লুট করে। পরিস্থিতি এতটাই বিস্ফোরক আকার ধারণ করে যে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরও প্রথম দিকে তা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। এই ঘটনায় দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রথম দিনের হামলা (২৬ জুলাই, শনিবার)
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটির সূত্রপাত হয় একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে। রংপুর আইটিসি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ১৭ বছর বয়সী এক হিন্দু ছাত্রের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নবী মুহম্মদ (সা.)-কে কটূক্তি করা হয়েছে – এমন গুজব শনিবার দুপুরের পর স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। খবর চাউর হতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে।
অভিযোগ ওঠার পর ওই কিশোরের বাবা সুজন রায় নিজের ছেলেকে দ্রুত থানায় নিয়ে গিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন, যাতে অপ্রীতিকর কিছু না ঘটে। তবে এতেও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। সন্ধ্যার পর মাইকিং করে লোক জড়ো হতে শুরু করে এবং রাত আনুমানিক ৮টার দিকে পাশের নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে ৬–৭ শত উগ্র লোকজন লাঠিসোটা হাতে নানান ধর্মীয় উসকানিমূলক শ্লোগান দিতে দিতে ‘আলদাতপুর ছয়আনি’ হিন্দুপাড়ায় হামলা চালায়।
প্রথমে হামলাকারীরা অভিযুক্ত কিশোর রঞ্জন কুমার রায়ের বাড়ি ভেবে তার চাচার বাড়িতে চড়াও হয় এবং সেখানে ভাঙচুর চালায়। এরপর তারা পাশের আরও তিনটি হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে। হামলায় আসা দলটির অনেকেই ছিল বহিরাগত – অনেকে নৌকায় বুল্লাই নদী পেরিয়ে অন্যান্য গ্রাম থেকে এসেছে বলে পরে জানা গেছে। গ্রামবাসীরা আতঙ্কে যে যার প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী অতুল চন্দ্র রায় বলেন, “রাত আটটার দিকে হঠাৎ করে পাশের এলাকা থেকে শত শত লোক এসে লাঠি নিয়ে হামলা শুরু করে। আমরা ভয় পেয়ে ঘর ছেড়ে পালাই।”
”পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু হামলাকারীদের ঢেউ এত প্রবল ছিল যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আক্রমণের শিকার হন – বাধা দিতে গিয়ে এক কনস্টেবল গুরুতর আহত হন,” ভয়েসকে বলেছেন গঙ্গাচড়া থানার ওসি আল ইমরান।
রাতের তাণ্ডবে অন্তত চারটি বাড়িঘর সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় এবং কিছু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এছাড়া কিছু গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত প্রাণীও লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
দ্বিতীয় দফার হামলা (২৭ জুলাই, রোববার)
শনিবার রাতের সহিংসতায় গ্রামটি থমথমে থাকলেও পরদিন আবার হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়। ২৭ জুলাই দুপুরের দিকে স্থানীয় মসজিদের মাইক থেকে লোকজন জড়ো হওয়ার আহ্বান করা হয় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। দুপুর প্রায় সাড়ে ৩টার সময়ে আগের রাতের চেয়েও অনেক বড় একটি দল – আনুমানিক ৩–৪ হাজার উত্তেজিত জনতা – ফের হিন্দুপল্লীতে চড়াও হয়। তারা ‘নবীর অবমাননার প্রতিশোধ’ ইত্যাদি শ্লোগান দিতে দিতে ক্ষুব্ধ মিছিলসহ গ্রামে ঢুকে পড়ে।
আগেই সেখানে আনসার, অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা সদস্য মোতায়েন ছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে, কিন্তু হাজারো লোকের এই আক্রমণে নিরাপত্তা ঘেরাও ভেঙে যায়। শুরু হয় তাণ্ডবের দ্বিতীয় পর্ব। ধর্মান্ধ দুর্বৃত্তরা ওই পাড়ার আরও অসংখ্য বাড়িঘরে ভাঙচুর চালায় এবং লুটপাট করে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য পরেশ চন্দ্র রায় বলেছেন ”দু’দিনের হামলায় ২০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়াও অন্তত ৪টি গরু, ৬টি ছাগল, সোনার গহনা, নগদ টাকা-পয়সা ও ফসলাদি লুটে নেওয়া হয়েছে।”
হামলাকারীদের লাঠির আঘাতে বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী আহতও হন। এক নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনাও শুনেছেন বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। গ্রামের একটি ছোট মন্দির ও পূজামণ্ডপও আক্রমণকারীরা ভেঙে তছনছ করে দেয়।
গৃহবধূ সন্ধ্যা রানি (৪৫) বলেন, “শনিবার রাতে আমরা পালিয়ে বেঁচেছিলাম। রোববার ওরা ফের এলো। চোখের সামনে আমার ঘর ভেঙে চুরমার করে দিলো, সব লুট করে নিলো। আমাদের জীবনের সঞ্চয় শেষ”। তাঁর পরিবার সদস্যরা প্রাণভয়ে যেদিকে পারেছে সেদিকে ছুটে যান। অনেকেই পাশের মুসলিম পাড়ার পরিচিত লোকজনের বাড়িতে বা আত্মীয়ের আশ্রয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান।
হামলাকারীরা রোববার বিকেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও আক্রমণ করে বসে। গঙ্গাচড়া থানার ওসি আল ইমরান জানান, “পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হামলাকারীরা আমাদের ওপরও চড়াও হয়”।
দু’দিন ধরে চলা এই ভয়াল হামলার থাবায় রংপুরের আলদাতপুর ছয়আনি হিন্দুপাড়া কার্যত এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। চারদিকে ভাঙা টিনের চাল, ভাঙা আসবাবপত্র আর পোড়া জিনিসপত্রের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যেসব হিন্দু পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁই মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে গেল, তাদের বেশিরভাগই দিনমজুর, কৃষক, জেলে বা ছোটখাট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত – সহায়-সম্বল তেমন নেই। ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন।
হামলায় কমপক্ষে দুই ডজন পরিবার পুরোপুরি গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং তাদের মূল্যবান সহায়-সম্পদ ও খাদ্যশস্য লুঠ হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় বাসিন্দা রবীন্দ্র চন্দ্র রায় জানান, “ওরা আমার দুইটা গরু আর টাকা-পয়সা নিয়ে গেছে, ঘরের চেয়ার-টেবিল সব ভেঙে ফেলেছে। আমরা আতঙ্কে আছি। পরিবারের মহিলাদের আর বাচ্চাদের আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি”।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত সুবল চন্দ্র রায়েরও একটি গরু ও একটি ছাগল লুট হয়েছে, ঘরের আসবাব ভাঙচুর হয়েছে বলে তিনি জানান। “পুলিশ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হামলাকারীরা উল্টো পুলিশকেই মারধর করেছে,” ভয়েসকে বলেছেন রবীন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং প্রশাসনের তৎপরতা
রোববার সন্ধ্যার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকাটিতে কঠোর অবস্থান নেয় এবং রাতের মধ্যে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়। রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামটি পরিদর্শনে যান। সোমবার (২৮ জুলাই) সকাল থেকে গ্রামে পুলিশ ও সেনাবাহিনী টহল জোরদার করা হয় এবং বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
আতঙ্কে পালানো পরিবারগুলোর অনেকেই সোমবার বিকেল থেকে ধীরে ধীরে বাড়িতে ফিরতে শুরু করে, যখন দেখে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাথমিক সহায়তা দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) সকাল থেকে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধার তত্ত্বাবধানে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামতের কাজ শুরু হয়।
উপজেলা প্রশাসন থেকে অসহায় পরিবারগুলোকে টিন, কাঠ, বাঁশ, শুকনো খাবার, রান্নার চুলা ও টিউবওয়েল সরবরাহ করা হয়েছে বাড়ি মেরামতে ও দৈনন্দিন চলার জন্য। রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত ২২টি পরিবারের মধ্যে ১৯টি পরিবার ইতোমধ্যে নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে। আমরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছি। সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন আছে, পরিস্থিতি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে”। তবে অভিযুক্ত কিশোর রঞ্জন রায় এবং তার চাচার পরিবারসহ তিনটি পরিবার নিরাপত্তার কারণে আপাতত পাশের গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে রয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ সুপার মো. আবু সাইম বলেন, হামলায় মোট ১২টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ২২টি পরিবার বাস করত। “১৯টি পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাসায় থাকছেন, কিন্তু বাড়িঘর ভাঙচুর ও ক্ষতি হওয়ায় মহিলা ও শিশুরা আপাতত অন্যত্র আত্মীয়দের কাছে রয়েছে। মেরামতের কাজ শেষ হলেই সবাই ফিরে আসবে,” বলেন এসপি। তিনি আরও জানান, হামলাকারীদের শনাক্তে কাজ শুরু হয়েছে এবং জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলা গ্রহণ ও গ্রেফতার
শনিবার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত হামলার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বা কাউকে গ্রেফতারও করেনি পুলিশ – যা নিয়ে সমালোচনা ওঠে যে প্রশাসন প্রথমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করেছে। ওসি আল ইমরান শুরুতে বলেছিলেন, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখছি। কেউ অভিযোগ দিলে সাথে সাথে মামলা নথিভুক্ত করা হবে”।
ঘটনার প্রায় তিন দিন পর, ২৯ জুলাই রাতে অবশেষে একটি মামলা গ্রহণ করে পুলিশ। হামলায় ঘরবাড়ি হারানো এক ভুক্তভোগী – তার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে নিরাপত্তার কারণে – গঙ্গাচড়া থানায় অজ্ঞাত ১,০০০–১,২০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা আসে তদন্তের।
পরদিন (৩০ জুলাই, বুধবার) এই হামলায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “গঙ্গাচড়ার হিন্দুপল্লীতে হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে”। গ্রেফতারকৃতদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ না করলেও জানা গেছে, তারা সবাই পাশের কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) ও গঙ্গাচড়ার আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা, যারা হামলার সময় সংঘবদ্ধ হয়েছিল।
৩০ জুলাই দুপুরে গ্রেফতারদের রংপুরের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলা দায়েরের দীর্ঘ বিলম্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান যে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ভয় ও নিরাপত্তাহীনতায় প্রথমে অভিযোগ করতে সাহস পায়নি। একাধিক পরিবার হামলাকারীদের চেনে, কারণ “ওদের অনেকে আশপাশের এলাকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিলে দেখা যায়”, কিন্তু প্রতিশোধের ভয়ে তারা চুপ ছিলেন বলে মন্তব্য করেন এক গ্রামবাসী। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর এবং প্রশাসন থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়ার পরই তারা অভিযোগ করতে সামনে আসে।
অন্যদিকে, যাকে কেন্দ্র করে এত কিছু – সেই অভিযুক্ত কিশোর রঞ্জন কুমার রায় এখন পুলিশের হাতে আটক আছে। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (সাইবার নিরাপত্তা আইন) অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে এবং তার বয়স বিবেচনায় তাকে আদালতের আদেশে জুভেনাইল সংশোধনাগারে (কিশোর হেফাজত কেন্দ্র) প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রোববার সকালে তাকে রংপুরের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে জামিন না দিয়ে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানায়, রঞ্জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে সে মহানবী সম্পর্কে ফেসবুকে কটূক্তি করেছে। গঙ্গাচড়া থানার ওসি আল ইমরান বলেন, “একটি ছেলেকে নিয়ে এমন পোস্টের অভিযোগ পাই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে আটক করি”। তবে রঞ্জন বা তার পরিবারের দাবি, এটি ফেক আইডির কারসাজি হতে পারে।
কিশোরের বাবা সুজন রায় শুরু থেকেই বলে আসছেন যে তার ছেলে এমন কিছু পোস্ট করেনি; কেউ ষড়যন্ত্র করে ফেক আইডি খুলে এটা চালিয়েছে। ফেসবুকে যেই অ্যাকাউন্ট থেকে বিতর্কিত পোস্টটি করা হয়েছে, সেটি একেবারেই নতুন ও ভেরিফায়েড নয় – ফলে সেটা রঞ্জনের নিজের আইডি কিনা বা ওই পোস্ট আদৌ সে করেছে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয় বলে উল্লেখ করেছে বিবিসি বাংলা।
পুলিশের তদন্তকারীরা এখন এই ফেসবুক অ্যাকাউন্টের প্রকৃত উৎস খুঁজে দেখছেন। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র স্থানীয়দের সন্দেহের বিষয়টি আমলে নিয়ে জানিয়েছে, “প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য সাইবার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া হচ্ছে।”
সরকার ও রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া
হামলার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন তৎপর হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সরকার শুরুতে বিষয়টি নিয়ে নীরবতা পালন করেছিল বলে সমালোচনা ওঠে। সাধারণত বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা না দিয়ে বরং সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয় এবং বলা হয় ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’। এই ক্ষেত্রেও প্রথম দুই দিন মন্ত্রিপরিষদ বা উচ্চপর্যায় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে ৩০ জুলাই (বুধবার) ঢাকা সচিবালয়ে ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ প্রসঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় “ধর্ম অবমাননাকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে… তবে এটাতে আমি মন্তব্য করতে চাই না, কারণ বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত”।
উপদেষ্টা আরও বলেন, “একটা কথা বলতে হয় – ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ বা ব্যঙ্গোক্তি করা আমাদের দেশে বহুকাল ধরে একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যেটা আমরা নিরুৎসাহিত করি”। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, এবং নবীকে অবমাননার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি শাস্তি পাবে।
তবে গঙ্গাচড়ার ঘটনায় যেটা হয়েছে তা আইন হাতে তুলে নেয়ার শামিল উল্লেখ করে উপদেষ্টা খালিদ হোসেন বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেফতার করেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় সনাতন ধর্মের মানুষের ওপর হামলা করা তো আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া। এটা আমরা চাই না”।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে হামলার শিকার কেউ যদি স্পেসিফিকলি (নির্দিষ্টভাবে) অভিযোগ দেন, তাহলে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে – এ কথা সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
মানবাধিকারের দাবি
ইতিমধ্যে বিচার ও ন্যায়বিচার দাবিতে বিভিন্ন মহল সরব হয়ে উঠেছে। ঘটনার পরদিন থেকেই মানবাধিকার সংগঠন ও বাম-প্রগতিশীল দলগুলো তীব্র নিন্দা জানাতে শুরু করে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা ২৯ জুলাই (মঙ্গলবার) গঙ্গাচড়ার আলদাতপুর হিন্দুপাড়া পরিদর্শন করেন এবং সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তারা রংপুর জেলা পুলিশের পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এক বিবৃতিতে বলেন, “অভিযোগ উঠতেই বাবা সুজন রায় ছেলেকে থানায় হস্তান্তর করেছেন। তারপরও শত শত লোক হামলা চালিয়েছে – এটা স্পষ্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। তিনি আরও জানান, “হিন্দুপাড়ার প্রায় ২৭শ মানুষের মধ্যে বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী; তাদের অনেকের ঘরবাড়ি এখন নেই, সহায়সম্বল নেই। সরকারকে অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে”।
একই দাবিতে ২৯ জুলাই পৃথক বিবৃতি দেয় ছ’টি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন – বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), নারীপক্ষ ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। এরা সবাই গঙ্গাচড়ার হামলাকে “মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংখ্যালঘু নাগরিকদের অধিকারের ওপর আঘাত” বলে আখ্যা দিয়েছে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
বাম রাজনৈতিক দল সিপিবি’র সভাপতি মো. শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স তাদের বিবৃতিতে সরাসরি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। তারা বলেছেন, “জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থার মধ্যে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর এই হামলা মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। অভিযুক্ত কিশোর গ্রেপ্তার হওয়ার পরও হামলা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্ব বাড়ছে”।
সিপিবি আরও উল্লেখ করেছে যে অতীতের প্রতিটি সাম্প্রদায়িক হামলাই প্রায় বিচারহীন থেকে গেছে, যার ফলে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের ভাষায়, “সংখ্যালঘু নির্যাতন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটা রাজনৈতিক সংকটের অংশ”।
অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন বলেছে, গঙ্গাচড়ার হামলা প্রমাণ করে দেশে ধর্মীয় উসকানি এখনো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মোটেই নিরাপদ নয়। এ ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সংগঠনটি ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছে – যার মধ্যে রয়েছে ঘটনাটিকে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা, প্রশাসনের গাফিলতি খতিয়ে দেখা, উসকানিদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের নাম প্রকাশসহ দ্রুত গ্রেফতার, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বারবার ঘটে চলা সংখ্যালঘু সহিংসতা রোধে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন গঠন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক বিবৃতিতে গঙ্গাচড়ার ঘটনাকে অত্যন্ত পরিকল্পিত হামলা আখ্যা দিয়ে বলেছে, “এক কিশোরের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো একটি সম্প্রদায়ের ওপর যেভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে, তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ এবং সংবিধানে প্রদত্ত সব নাগরিকের সমান অধিকারের পরিপন্থী”।
আসক আরও বলেছে, “ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর এই ধারাবাহিক হামলা উদ্বেগজনকভাবে ঘটেই চলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিচারহীনতার এক ভয়াবহ নজির তৈরি করছে”।
আসকের বক্তব্য, গঙ্গাচড়ার হামলার ঘটনায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না; যারা অপরাধ করেছে এবং যারা দায়িত্বে থেকেও হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে উভয়েরই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংগঠনটি দাবি জানিয়েছে অবিলম্বে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তি দেয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের নিরাপত্তা ও যথোচিত ক্ষতিপূরণ এবং সাম্প্রদায়িক উসকানি রোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস (হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি) তার বিবৃতিতে বলেছে, এ ধরনের হামলা শুধু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকিই নয়, বরং বাংলাদেশের সংবিধান, ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতিরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংগঠনটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ পুনর্বাসন এবং এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসনিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দলের নেতারাও সম্প্রীতির ডাক দিয়েছেন। গঙ্গাচড়ার ঘটনার পর রংপুর জেলা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পৃথকভাবে মিছিল-সমাবেশ করেছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে। জাহাঙ্গীরনগরে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আয়োজিত এক সমাবেশে Anthropology বিভাগের ছাত্র নূর-এ তামিম বলেন, “পুলিশ আর সেনাবাহিনীর সামনে ১৫-১৭টা হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর আর লুট হলো। আমরা ধর্মীয় সম্প্রীতির বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান”।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উদ্বেগ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গঙ্গাচড়ার এই ঘটনাটি নতুন কোনো নজির নয়। গত এক দশকে বহুবার দেখা গেছে, ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কথিত ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরবর্তীতে অভিযোগগুলো নির্ভরযোগ্য প্রমাণে পরিণত হয়নি; বরং পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে উগ্রগোষ্ঠীগুলি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে – এমন প্রমাণ মিলেছে।
২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধপল্লীতে রাতারাতি অগ্নিসংযোগ ও মন্দির ভাঙচুর, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ২০১৭ সালে রংপুরেরই ঠাকুরপাড়া গ্রামে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব – এসব ঘটনায় দেশের চিত্র কলঙ্কিত হয়েছে। দুঃখজনক হলো, অন্য কোনো ঘটনারই সঠিক বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি বলে পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য। বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার সুরক্ষিত থাকলেও বাস্তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রায়ই নিগ্রহের শিকার হয় এবং বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হয় বলে মানবাধিকারকর্মীরা হুঁশিয়ার করে আসছেন।
সম্প্রতি দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ওই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সহিংসতা ঘটে যার খুব কম ক্ষেত্রেই দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর মাত্র প্রথম সপ্তাহেই ৫২টি জেলায় প্রায় ২০০টি হামলার ঘটনা ঘটে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। ভারতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় ওই সময় বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করেছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ঘটনার আকৃতি ও সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে একে “অতিরঞ্জিত প্রচারণা” বলেছে।
এত কিছুর পরও বাস্তবতা হলো, সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঢাকার এক হিন্দু ব্যাংক কর্মকর্তা দেশরাজ ভট্টাচার্য আল জাজিরাকে বলেন, “হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে গ্রামে-গঞ্জে হিন্দুদের মাঝে ভয় ও অনিরাপত্তা চেপে বসেছে… আগেও ক্ষমতা বদলের সময় হামলা হয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়”। ঢাকার এক হিন্দু ছাত্র অভ্র শৌম পিয়াস মন্তব্য করেন, “সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিপীড়নের গণনা করা কঠিন – অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে। অনেক হিন্দু তাদের ভিটে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, জায়গা-জমি দখল হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচার-ক্ষতিপূরণ কিছুই মেলেনি”।
এলাকার হিন্দুরা এখনো ভীত-সন্ত্রস্ত
গঙ্গাচড়ার আলদাতপুর গ্রামের হিন্দুপল্লীর বাসিন্দারা এখনও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বাড়িঘর মেরামত শুরু হলেও আতঙ্ক কাটেনি। গ্রামটির হাইস্কুল ও প্রাইমারি স্কুলে হামলার পর দুদিন ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়; অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের বা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে পুনরায় ক্লাস শুরু হয়েছে, তবে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
সন্ধ্যা হলেই অনেক পরিবার আজও আতঙ্কে তন্দ্রাহীন রাত কাটাচ্ছে পাহারা দিয়ে। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন – “এই হামলার ন্যায়বিচার হবে তো?” ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আগের অনেক ঘটনার মতো যদি এটিও ধামাচাপা পড়ে যায়, তাহলে সামনে যে কোনো অজুহাতে আবার এমন হামলা হতে পারে।
স্থানীয় হিন্দু নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন বটে, তবে নিজেরাও সন্দিহান। ঐক্য পরিষদের স্থানীয় নেতা তপন কুমার রায় বলেন, প্রশাসন দুর্গতদের ত্রাণ ও মেরামতকাজে সক্রিয় হয়েছে, “এবার দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে”।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি কর্তারা বারবার আশ্বস্ত করছেন যে দোষীরা ছাড় পাবে না। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় আস্থা আসে না অনেকের। গঙ্গাচড়ার এক হিন্দু বৃদ্ধা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, ভোটের সময়ে সবাই আসে সাথে থাকার আশ্বাস দিতে। কিন্তু বিপদে আমাদের জীবন-মৃত্যু আল্লাহ ভরসা! কেউ পাশে থাকে না। হামলাকারীরা ধরা পড়লেও পরে ছাড়া পেয়ে যায়” – কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ ভিজে ওঠে।
গ্রামের মন্দিরটির পুরোহিত মনোরঞ্জন বাবু আক্ষেপ করে বলেন, “বাংলাদেশের হিন্দুদের জীবনে নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। আমরা এ দেশকে ভালোবাসি, দেশের জন্যই এখানেই আছি। আমাদের নাগরিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব – বারবার সেটা ক্ষুণ্ণ হলে দেশ এগোবে কী করে?”
বাস্তবতা হলো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বহুদিনের যে সুনাম, সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় তা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গঙ্গাচড়ার মাটিতে মিশে যাওয়া ভাঙা প্রতিমার টুকরো আর পোড়া ঘরের কাঠ-আসবাবের স্তূপের দিকে তাকিয়ে স্থানীয় হিন্দু পরিবারগুলো আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তায় দিন গুনছে – এই আশায় যে, হয়তো বিচার হবে, হয়তো এই দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি আর হবে না।

