গোপালগঞ্জ গণহত্যার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি জিসিডিজির

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি

ডার্টমাউথ, কানাডা | ২৭ জুলাই, ২০২৫
গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স (জিসিডিজি) নামের কানাডাভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে ঘটে যাওয়া গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

সোমবার (২৮ জুলাই) এক বিবৃতিতে জিসিডিজি জানায়:

“গোপালগঞ্জের গণহত্যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। প্রতিটি শিশু ও নির্যাতিত মানুষের জন্য ন্যায়বিচার চাই।”

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন দীপ্ত সাহা (২৫), রমজান কাজী (১৮), ইমন শেখ (২৪) ও সোহেল মোল্লা (৪১)। আহত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন রমজান মুন্সি (৩২)।

জিসিডিজি অভিযোগ করে, এই হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই এলাকাজুড়ে ভয়ভীতি, ধরপাকড় ও নির্যাতনের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থির করে তোলে সরকারপন্থী ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। এনসিপির এক সমাবেশের নিরাপত্তার অজুহাতে শুরু হয় নির্বিচার অভিযান, যার ফলে ৫০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং শতাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন।

সংগঠনটি জানায়, আহতদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, এবং নিহতদের ময়নাতদন্ত, ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু, এমনকি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনে বাধা দেওয়া হয়।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ছিল ১৮ শিশুর গ্রেপ্তার, যাদের মধ্যে একজন মাত্র দুধ কিনতে বেরিয়েছিল। শিশু অধিকার কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে জিসিডিজি।

সংগঠনটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা হারানোর বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষায়, সেনাবাহিনী পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে মিলে সাধারণ জনগণকে টার্গেট করছে, যা সামরিক শক্তির অপব্যবহারের বহিঃপ্রকাশ। এর পেছনে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি ধ্বংসের হুমকি ও এনসিপির উসকানিমূলক কর্মসূচি, যা জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সেনা-সমর্থিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস। এরপর থেকেই দেশে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গ্রেপ্তার, ঘরবাড়ি ধ্বংস ও লুটপাট চলমান রয়েছে। রাজনৈতিক বন্দিদের আদালতে হেনস্থা, এবং সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে এনসিপি নেতাদের নেতৃত্বে দেশজুড়ে সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধ্বংস করে এনসিপি-সমর্থিত কর্মীরা। এরপর ঘোষণা করা হয় “গোপালগঞ্জ অভিমুখে পদযাত্রা”, যার লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর সমাধি ধ্বংসের হুমকি দেওয়া। গোপালগঞ্জ—বঙ্গবন্ধুর নিজ জেলা—যেখানে আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রায় সর্বজনীন, সেখানকার জনগণ প্রতিবাদে সোচ্চার হলে শুরু হয় ভয়াবহ দমন অভিযান, যার পরিণতিই গোপালগঞ্জ গণহত্যা।

জিসিডিজি জানায়, তারা ইতোমধ্যে নিহতদের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেছে এবং একটি স্বতন্ত্র তদন্ত শুরু করেছে।

সংগঠনটি জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার, স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়র, গণতান্ত্রিক দেশসমূহ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজের প্রতি চারটি প্রধান দাবি জানিয়েছে:

  • গোপালগঞ্জ গণহত্যার আন্তর্জাতিক ও স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা
  • আটককৃত শিশু ও নিরীহ নাগরিকদের অবিলম্বে মুক্তি
  • বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা
  • চলমান দমন-পীড়ন বন্ধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ

“গোপালগঞ্জের গণহত্যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। প্রতিটি শিশু ও নির্যাতিত মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার চাই।” — বিবৃতিতে জিসিডিজি।

spot_img
spot_imgspot_img