সহযোগীদের ঐক্যমত্য: কেউ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবে না

সেনাসমর্থিত ইউনূস সরকারের মিত্রদের নেতৃত্বে সংলাপে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সিয়াম পারভেজ, ঢাকা, ২৮ জুলাই ২০২৫ — চলমান জাতীয় সংলাপের দ্বিতীয় ধাপে, সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের অনুগত রাজনৈতিক দলগুলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে:

  • কোনো ব্যক্তি যেন ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকতে না পারেন, এবং
  • একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা, যা পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও জনবান্ধবতা নিশ্চিত করবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ আজ রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সংলাপের ১৯তম দিনে এই সিদ্ধান্ত জানান।

“জুলাই সনদে আমরা ১০ বছরের মেয়াদসীমা অন্তর্ভুক্ত করব,” বলেন রীয়াজ।

আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল শক্তিকে বাদ দেওয়া হয়েছে

তবে এই সংলাপে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাউকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আওয়ামী লীগের মতো দেশের সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়েই সংবিধান ও রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে সরকার পরিচালনা থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যাকাল ১০ বছরের মধ্যে সীমিত করার ষড়যন্ত্র সাজানো হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকরা। শেখ হাসিনা এখনও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে বিবেচিত, এবং তাঁকে বাদ দিয়ে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে না বলে মন্তব্য অনেকের।

উল্লেখ্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, যা কার্যত একদলীয় শাসনের দিকে ইঙ্গিত দেয়।

গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস। তারপর থেকেই সারা দেশে গণধর্ষণ, লুটপাট, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের এক ভয়াবহ বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী—

  • শত শত মানুষ গণপিটুনিতে মারা গেছেন,
  • হাজার হাজার পরিবার শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ-সমর্থক হওয়ায় নিপীড়নের শিকার হয়েছে,
  • হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার,
  • আদালত প্রাঙ্গণেই রাজনৈতিক বন্দিদের উপর হামলার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।

এসব সহিংসতার পেছনে সরকার-সমর্থিত ছাত্র ও যুবকর্মীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ, যাঁরা বিভিন্ন বাহিনীর উপস্থিতিতেই বাড়ি বাড়ি হামলা চালিয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের দাবির বিপরীতে সাংবিধানিক জটিলতা

বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তাই এই সিদ্ধান্তকে সংবিধানে যুক্ত করতে হলে সংসদীয় সংশোধন দরকার। কিন্তু বর্তমান সরকার সংসদ ভেঙে দিয়েছে, ফলে কোনো বৈধ পদ্ধতিতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা এখন সম্ভব নয়। বিশ্লেষকরা একে অবৈধ ও একচেটিয়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমেদ সংলাপে বলেন,

“আমরা বলেছি, কেউ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবে না।”
“নির্বাচন কমিশন গঠনে সাংবিধানিক বিধান যুক্ত করার ব্যাপারে একমত হলে আমরা তা সমর্থন করব।”

তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, সম্মত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হলে বিএনপি তার পূর্ব শর্তে অটল থাকবে।

স্বাধীন পুলিশ কমিশন: সম্মতির আড়ালে প্রশ্ন

পুলিশের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আলাপ-আলোচনার পর উপস্থিত দলগুলো এ বিষয়ে সম্মত হয় বলে জানান আলী রীয়াজ।

“আমরা সবাই পুলিশ কমিশনের প্রস্তাবে একমত। এখন গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলবে,” বলেন তিনি।
“এই কমিশন পুলিশি পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও জনসেবার মান নিশ্চিত করবে।”

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতন, রাজনৈতিক হয়রানি ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ তুলেছে। বর্তমান প্রস্তাব এইসব গুরুতর অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে সমালোচকদের অভিমত।

জুলাই সনদ: গণতন্ত্র না আত্মপ্রবঞ্চনা?

ইউনূস-সমর্থিত দলগুলো “জুলাই সনদ”–কে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ হিসেবে তুলে ধরলেও, সমালোচকরা এটিকে একটি অস্বচ্ছ ও চিহ্নিত লক্ষ্যবিহীন সংস্কার পরিকল্পনার নামান্তর বলে মনে করছেন—যার উদ্দেশ্য হচ্ছে অবৈধ সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল সংলাপকে স্বাগত জানালেও তারা বারবার বলেছে, আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া এই প্রক্রিয়া কখনোই বৈধতা পাবে না।

বেসরকারি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মতে, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি হচ্ছে—মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। অন্যথায় ইউনূস প্রশাসনের তথাকথিত সংস্কার পরিকল্পনা শুধুই একটি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে রয়ে যাবে।

spot_img
spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles