গোপালগঞ্জ সংঘর্ষে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে: আসক

১৬ জুলাই গোপালগঞ্জ সংঘর্ষের উপর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, বহু আহত হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে শিশুদের আটক করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই প্রিয়জনদের দাফন করার জন্য পরিবারগুলিকে চাপ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গোপালগঞ্জের বর্ণনাতীত সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এই সংঘর্ষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

২১-২২ জুলাই দুই দিনব্যাপী গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলায় তদন্ত চালিয়ে আসকের একটি প্রতিনিধি দল এই তথ্য সংগ্রহ করে।

কী বলছে আসকের তদন্ত?

আসকের প্রতিনিধি দল নিহতদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা, চিকিৎসক, সাংবাদিক, পুলিশের পাশাপাশি জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেন। ২২ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে তারা ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “সর্বোচ্চ সংযমের কথা বললেও, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অতিমাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করেছে। এমনকি, বেসামরিক ও নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হয়েছে, যা আইন বহির্ভূত ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।”

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়ার ও মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।

সরাসরি গুলি ও শিশুদের লক্ষ্য করা হয়

আসক জানায়, সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হন এবং ২৭ জন আহত হন, যাদের মধ্যে চারজন শিশু। সেনাবাহিনী ও পুলিশের অস্ত্রের গুলিতেই অধিকাংশ হতাহত হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রিকশাচালক, দোকানদার, পথচারীসহ সাধারণ মানুষ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “স্থানীয়রা জানায় সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলি ও সেনাবাহিনীর চড়াও হওয়ার ঘটনায় অনেক মানুষ পালাতে গিয়ে পড়ে যায়, কিছু জায়গায় পদদলিত হয়।”

গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র

আসকের দলটি জানায়, সংঘর্ষ-পরবর্তী অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠে। একজনের পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

এছাড়াও, একজন বন্দী গ্রেপ্তারের পর নিহত হন বলে প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে। এরকম আরও বেশ কিছু ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলেও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।

সেনাবাহিনীর অবস্থান ও পুলিশের অস্বীকার

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ কর্তৃপক্ষ আসকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও সেনাবাহিনী তাদের সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগে আসেনি।

গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার ও অফিসার ইন চার্জ (ওসি) গুলির বিষয়ে কোনো সদুত্তর দেননি। তারা দাবি করেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখা হয়েছে।”

মামলা ও গণগ্রেফতার

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষ-পরবর্তী সময়ে আটটি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি মামলায় আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৪০০ জনের বেশি। অভিযোগপত্রে অনেক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ও শিশুর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আসক বলেছে, “এসব মামলার বেশিরভাগই প্রতিহিংসামূলক ও আইনি মানদণ্ড মেনে করা হয়নি।”

চিকিৎসা ও হাসপাতাল পরিস্থিতি

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২৪ জন আহতের মধ্যে ২১ জন সাধারণ মানুষ, ২ জন পুলিশ সদস্য এবং একজন স্থানীয় প্রশাসনের গাড়িচালক।

তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

লাশ দাফন, ময়নাতদন্ত ও হয়রানি

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ জন নিহতের মধ্যে শুধুমাত্র একজনের দেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। বাকিদের দাফন তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়।

পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে ছয়টি মরদেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হলেও, পরিবারগুলো এতে হয়রানির শিকার হয়েছে বলে জানায়।

উত্তেজনা সৃষ্টির পেছনে দায়ী উসকানি

আসকের প্রতিনিধি দল জানায়, সংঘর্ষের আগের দিন এনসিপি-সমর্থকরা বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলের সামনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়। তারা বলেন, সমাধিস্থল তুলে ফেলা হবে এবং মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে।

এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে সংঘর্ষের পটভূমি তৈরি করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

আসকের সুপারিশ

প্রতিবেদনের শেষে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সংঘর্ষের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তারা সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।

spot_img
spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles