চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর আনার পক্ষে সাখাওয়াতের যুক্তি

ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং টার্মিনালে বিদেশি অংশীদার নিয়োগে আগ্রহী, যদিও নৌবাহিনী পরিচালিত অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

নাঈম আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম –
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করছে সেনা সমর্থিত অন্তর্বতী সরকার। তারা বলছে, এর উদ্দেশ্য হল বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ নৌবাহিনী-সমর্থিত চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল)-এর অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় বন্দরের কার্যক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।

শুক্রবার সকালে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিদর্শনের সময় নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা বর্তমানে আমাদের বন্দরগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছি। কিন্তু আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রবেশ করতেই হবে। এজন্য বৈশ্বিক অপারেটর নিয়োগ অপরিহার্য।”

অস্থায়ী পরিবর্তন ও পারফরম্যান্স বৃদ্ধির চিত্র

সাঈফ পাওয়ারটেক লিমিটেড ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে টার্মিনালটি পরিচালনা করার পর সরে দাঁড়ায়। এর পর সরকার ৭ জুলাই থেকে সিডিডিএল-কে অস্থায়ীভাবে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়।

সিডিডিএল-এর অধীনে ইতিমধ্যেই ইতিবাচক ফলাফল মিলেছে। চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মীর এরশাদ আলী জানান, জাহাজের বার্থিং সময় গড়ে ১০ ঘণ্টা কমেছে এবং মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিদর্শনের সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ অন্যান্য নৌ ও বন্দর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরবর্তী ধাপ: সামনে ডিপি ওয়ার্ল্ড

বর্তমানে সরকার দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক পোর্ট লজিস্টিকস সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আলোচনা করছে। আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সিডিডিএল-ই এনসিটি পরিচালনা করবে।

নৌ পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, “এটা এক কোম্পানিকে সরিয়ে অন্যটিকে বসানোর ব্যাপার নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষতা বৃদ্ধি। আমি নিজে বিশ্বের অনেক বন্দর ঘুরে দেখেছি। এখানে আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই—আমি তো চট্টগ্রামেরও নই।”

তিনি আরও বলেন, “সাঈফ পাওয়ারটেক অনেক বছর ভালোভাবে কাজ করেছে। তবে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক চাহিদা মোকাবিলায় আমাদের আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।”

জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি

বিদেশি অংশীদারিত্ব জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি হতে পারে—এমন সমালোচনার জবাবে সাখাওয়াত বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয় সম্পদ, এটি সবসময় বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। যারা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন, তাদের দেশপ্রেমের কথা চিন্তা করে বিষয়টি নতুন করে ভাবা উচিত।”

বন্দর শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে। “পরিমার্জনের পরও চট্টগ্রামের ফি বিশ্বের অনেক শীর্ষ বন্দরের তুলনায় কম,” তিনি যোগ করেন।

ভবিষ্যতের দৃষ্টি

সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে চাই না। আমরা এগিয়ে যেতে চাই এবং আন্তর্জাতিক লজিস্টিক নেটওয়ার্কের অংশ হতে চাই।”

বিদেশি অপারেটর নিয়ে উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের সৃষ্টি করে আসছে। সমালোচকরা জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। তাদের আশঙ্কা, কৌশলগত পরিকাঠামোতে বিদেশি জড়িত থাকার ফলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই সন্দেহের পেছনে রয়েছে অতীতের কিছু আঞ্চলিক উদাহরণ, যেখানে আরব আমিরাত, চীন বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নশীল দেশের বড় বড় বন্দরগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অধিকার পেয়েছে। এ ধরনের চুক্তির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার সীমিতকরণ বা ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মতো ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয় যখন সরকার চট্টগ্রামের নিউ মুরিং টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। শ্রমিক ইউনিয়ন, জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং শিপিং সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ মনে করে, বিদেশি অপারেটররা শুধুমাত্র লাভের দিকেই নজর দেবে, স্থানীয় কোম্পানিগুলোর ভূমিকা কমে যাবে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে।

তবে সমর্থকরা বলছেন, বৈশ্বিক অপারেটররা উন্নত প্রযুক্তি, দ্রুত কার্যপ্রবাহ এবং উচ্চ দক্ষতা নিয়ে আসে—যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বন্দরজট কমাতে সাহায্য করতে পারে।

দক্ষতা বনাম জাতীয় স্বার্থ—এই বিরোধার্থক উত্তেজনা চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে প্রবলভাবে স্পষ্ট, কারণ এটি দেশের ৯০% কনটেইনার বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

spot_img
spot_imgspot_img