সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ‘সূক্ষ্ম কৌশলে’ শেখ হাসিনা সরকারের পতন: নর্থইস্ট নিউজের দাবি

Date:

ঢাকা, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন একটি ‘সূক্ষ্ম কৌশল’-এর ফল—এমন দাবি করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ। সাংবাদিক এনায়েত কবিরের লেখা ‘বাংলাদেশের মুখোশ উন্মোচন পর্ব ৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রথমে শেখ হাসিনাকে নিজেদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে তোলেন এবং পরে একটি পরিকল্পিত বেষ্টনীর মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ থাকলেও, সামরিক বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছিল শেখ হাসিনার বড় কৌশলগত ভুল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়।

পতনের চূড়ান্ত মুহূর্ত
নর্থইস্ট নিউজের দাবি, ৫ আগস্ট বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর গন্তব্য সম্পর্কে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিশ্চিত ছিল না। তবে তার আগেই শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আর্টিলারি ডিভিশনের নির্দেশে উত্তরা এলাকায় কারফিউ ব্যারিকেড হঠাৎ তুলে নেওয়া হলে সরকার পতনের পথ সুগম হয়। একই সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

দেশত্যাগ ও ভারতীয় ভূমিকা
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে কার্যত দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তিনি প্রথমে ধারণা করেছিলেন নিরাপত্তার জন্য তাঁকে টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কুর্মিটোলা ঘাঁটিতে পৌঁছে বাস্তবতা অনুধাবন করেন। দাবি করা হয়, আগেই ভারতের সেনাপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশি সামরিক বিমানের জন্য ভারতীয় আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে ভারতের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দিল্লিতে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি আরও দাবি করে, গণভবনে জনসমাগমের মাধ্যমে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে একটি ‘যুদ্ধাবস্থা’ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল, যাতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ তৈরি হয়। তবে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

‘চট্টগ্রাম বলয়’ ও সামরিক নির্ভরতা
নর্থইস্ট নিউজের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার চারপাশে একটি প্রভাবশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে তাঁকে গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়। এতে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার অবস্থান পরিবর্তন
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং তারা আন্দোলনকে আরও তীব্র রূপ নিতে দেয়। ছয়জন ছাত্রনেতাকে আটক করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি আদায় করার ঘটনাকে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পতনের পর পরিস্থিতি
সরকার পতনের পর প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। কেউ কেউ সেনানিবাসে আশ্রয় নিলেও, পরে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। আবার কিছু নেতাকে নিরাপদে দেশ ছাড়তেও সহায়তা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসন ও রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, নর্থইস্ট নিউজের এই প্রতিবেদনটি একটি বিশ্লেষণধর্মী দাবি-নির্ভর লেখা। এতে উত্থাপিত অভিযোগ ও তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, পানিবন্দী ১০ লক্ষাধিক, অবহেলায় বিপন্ন মানুষ

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সাত জেলার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকট।

সহিংসতা ও মানবাধিকার সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

এইচআরএসএসের জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধস, নিহত ৯

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে টানা বর্ষণে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে, আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে আইন শিক্ষার্থীর মৃত্যু: পুলিশের বর্ণনায় মিলছে না নানা তথ্য

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী আইন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুকে ঘিরে ডিবির দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি মিলেছে। মারধর ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ এনেছে নিহতের পরিবার।