রাশিয়া থেকে আরও পাঁচটি এস-৪০০ কিনতে চায় ভারত

Date:

ভারতের প্রতিরক্ষা নীতি আরও একবার বড় কৌশলগত মোড় নিতে চলেছে। নয়াদিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে পাঁচটি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ২০১৮ সালে প্রথম চুক্তির মাধ্যমে পাঁচটি এস-৪০০ ইউনিট কেনার পর এবার এটি হবে ভারতের দ্বিতীয় ধাপের ক্রয় পরিকল্পনা।

শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘের

ভারতের সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই ইউনিটগুলো যুক্ত হলে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা অনেক বেশি স্তরযুক্ত ও ঘন হবে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এস-৪০০ সিস্টেমগুলো মূলত দেশের উত্তর সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে স্থাপন করা হবে—যেখানে চীন ও পাকিস্তান দুই প্রতিবেশী দেশ থেকেই নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে।

এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ভূমি থেকে আকাশে আঘাত হানতে সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা একইসঙ্গে শত্রু বিমান, ক্রুজ মিসাইল, এমনকি ব্যালিস্টিক মিসাইল পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারে। একেকটি ইউনিট প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।

২০১৮ সালের চুক্তি ও বিলম্বিত সরবরাহ

ভারত ২০১৮ সালে রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে পাঁচটি এস-৪০০ ইউনিট কেনে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে ভারতের সরবরাহ সময়সূচিতেও। এখন পর্যন্ত দুইটি ইউনিট ভারতে পৌঁছেছে, বাকি তিনটি ২০২৬ সালের মধ্যে হাতে পাওয়ার কথা।

এই পরিস্থিতিতেই নয়াদিল্লি নতুন করে আরও পাঁচটি সিস্টেম কেনার পরিকল্পনা করছে, যা সরাসরি ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়াবে এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা

এতসব সাফল্যের মাঝেও রয়েছে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের CAATSA (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা দেশগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকে। ২০১৮ সালের চুক্তির সময়ও ভারত এই আইনের আওতায় আসতে পারত, কিন্তু ওয়াশিংটন তখন নয়াদিল্লিকে ছাড় দিয়েছিল।

এবার নতুন ক্রয় চুক্তি হলে সেই চাপ আবার বাড়তে পারে। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব যেমন—F-414 জেট ইঞ্জিন ও ড্রোন প্রকল্পে যৌথ উৎপাদন—তা এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

“মেড ইন ইন্ডিয়া” বিকল্প পথ

রাশিয়া থেকে নতুন ইউনিট কেনার পাশাপাশি ভারত নিজস্ব দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগও নিচ্ছে। “প্রজেক্ট কুষা” নামের এই প্রকল্পে দেশীয় প্রযুক্তিতে এস-৪০০-সমমানের একটি লং-রেঞ্জ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (LR-SAM) তৈরি করা হচ্ছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে প্রোটোটাইপ পরীক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে সময় লাগবে। তাই রাশিয়ার কাছ থেকে অতিরিক্ত এস-৪০০ কেনা আপাতত একটি কার্যকর “ব্রিজ সলিউশন”—অর্থাৎ স্বনির্ভর সক্ষমতা গড়ে ওঠা পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী সুরক্ষা।

কৌশলগত ভারসাম্যের বার্তা

পাঁচটি নতুন এস-৪০০ ইউনিট যুক্ত হলে ভারত মোট দশটি রেজিমেন্ট বা প্রতিরক্ষা ব্যাটারি পাবে, যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় এস-৪০০ স্থাপনা হবে। এটি শুধু সামরিক শক্তি বাড়ানো নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বার্তাও—ভারত এখনো মস্কো ও ওয়াশিংটন—উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্প্রতি ভারতকে “বিশ্বস্ত কৌশলগত মিত্র” বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা গভীর করছে। তাই নয়াদিল্লির জন্য এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পরীক্ষা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, পানিবন্দী ১০ লক্ষাধিক, অবহেলায় বিপন্ন মানুষ

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সাত জেলার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকট।

সহিংসতা ও মানবাধিকার সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

এইচআরএসএসের জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধস, নিহত ৯

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে টানা বর্ষণে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে, আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে আইন শিক্ষার্থীর মৃত্যু: পুলিশের বর্ণনায় মিলছে না নানা তথ্য

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী আইন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুকে ঘিরে ডিবির দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি মিলেছে। মারধর ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ এনেছে নিহতের পরিবার।