আফগানিস্তান: ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে মানুষের আর্তনাদ; ত্রাণ আটকে আছে রাজনীতির জালে

Date:

সেপ্টেম্বরের প্রথম রাত। আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশে গভীর ঘুমে থাকা মানুষ হঠাৎই ঘুম ভাঙে বিপর্যয়ে। পৃথিবীর যেন তাদের উপর ভেঙে পড়েছে। মাত্র ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্প মুহূর্তেই মাটির ঘরবাড়ি, কাঠের চাল ও কাদামাটির দেয়াল ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত। পুরো গ্রাম এক রাতে পরিণত হয়েছে কবরস্থানে।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১,৪১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ৩,০০০ এর বেশি মানুষ। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে নিহতের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে।

ভূমিকম্পের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ৫.২ মাত্রার আরেকটি আফটারশক আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

পাহাড়ি গ্রামগুলোয় মর্মান্তিক দৃশ্য

গ্রামের মাটির ঘরগুলো এমন ঝাঁকুনিতে টিকতে পারেনি। রাতের আঁধারে ছাদ ভেঙে পড়ে পরিবারগুলিকে চাপা দেয়। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ইন্দ্রিকা রাটওয়াটে বলেছেন, “এটি একেবারে সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়। প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যু বাড়ছে।”

আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মীরা জানান, পিঠে চিকিৎসা সরঞ্জাম বেঁধে ১৯ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছে। কারণ পাহাড় ধসে যাওয়ায় রাস্তাগুলো গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত নেই। হেলিকপ্টার অবতরণ করতে না পারায় আফগান সেনারা পাহাড়ি ঢালে প্যারাশুটে নেমে আহতদের উদ্ধার করেছে।

ত্রাণ ও রাজনীতির সংঘর্ষ

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর এটি তৃতীয় বড় ভূমিকম্প। তবে এবার আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। অনেক দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে রাজি নয়।

যুক্তরাজ্য £১ মিলিয়ন সহায়তা দিয়েছে, তবে সরাসরি তালেবান নয়, জাতিসংঘ ও রেড ক্রসের মাধ্যমে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৩০ টন সরঞ্জাম ও ১ মিলিয়ন ইউরো পাঠাচ্ছে। ভারত ১,০০০ পরিবারকে তাবু ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে। চীন, পাকিস্তান, ইরান ও ইউএই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এগুলো পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তহবিল সংকটে আফগানিস্তানের ৪২০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ আছে, যার মধ্যে আছে কুনারের ৮০টি ক্লিনিক। আহতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রথম ২৪-৭২ ঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে।

বেঁচে থাকার সংগ্রাম

কুনারে অস্থায়ী ত্রাণ শিবির গড়ে উঠেছে। তালেবান প্রশাসন আহতদের স্থানান্তর, মৃতদের দাফন ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য দুটি সমন্বয় কেন্দ্র চালু করেছে। কিন্তু তাবু, পানি, খাবার—সবই অপ্রতুল। শিশুরা ধ্বংসস্তূপে খেলনা খুঁজছে, মায়েরা ধুলো মাখা হাতে শিশুদের আঁকড়ে ধরে আছে।

আফগানিস্তান যেন পরপর এক বিপর্যয় থেকে আরেক বিপর্যয়ে ডুবে যাচ্ছে। জাতিসংঘের রাটওয়াটে বলেছেন, “আফগান জনগণকে আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না। তারা বহু সংকট একসঙ্গে সামলাচ্ছে।”

এই ভূমিকম্প আবারও প্রমাণ করেছে, আফগানিস্তানের বিপর্যয় শুধু প্রকৃতির কারণে নয়; রাজনীতি ও বিশ্ব বিচ্ছিন্নতার কারণেও সহায়তা আটকে থাকে। ভূমিকম্প শেষ হলেও মানুষের দুঃস্বপ্নের শেষ হয়নি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, পানিবন্দী ১০ লক্ষাধিক, অবহেলায় বিপন্ন মানুষ

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সাত জেলার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকট।

সহিংসতা ও মানবাধিকার সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

এইচআরএসএসের জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধস, নিহত ৯

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে টানা বর্ষণে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে, আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে আইন শিক্ষার্থীর মৃত্যু: পুলিশের বর্ণনায় মিলছে না নানা তথ্য

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী আইন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুকে ঘিরে ডিবির দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি মিলেছে। মারধর ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ এনেছে নিহতের পরিবার।