বড় দলগুলোকে বাদ দিয়ে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের তৎপরতা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক

Date:

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে প্রণীত তথাকথিত ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে দেশজুড়ে বাড়ছে সন্দেহ ও সমালোচনা। সরকার যে জাতীয় ঐকমত্যের দাবি করছে, তা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। কারণ, সনদ বাস্তবায়নের আলোচনায় দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। কিন্তু কমিশনের সহসভাপতি প্রফেসর আলী রীয়াজ স্বীকার করেছেন, অংশগ্রহণকারী দলগুলো একমত হতে না পারলে তারা সরকারের কাছে একাধিক প্রস্তাব পেশ করবেন—যা কার্যত স্বীকারোক্তি যে, “জাতীয় ঐকমত্য” বলার মতো কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।

রবিবার ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংলাপে আলী রীয়াজ জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছয়টি পৃথক বাস্তবায়ন প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি বলেন, এগুলো একত্র করে একটি খসড়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞ ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। কমিশন জানিয়েছে, তারা ১৫ অক্টোবরের মধ্যেই চূড়ান্ত প্রস্তাব পেশ করতে চায়, কারণ ওই দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হবে।

বড় দলগুলোকে বাদ দিয়ে ‘ঐকমত্য’ গড়ার চেষ্টা

ঐকমত্য কমিশনর আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ১৪টি বামপন্থী দলকে—যারা মিলে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করে।

এর পরিবর্তে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছে বিএনপি, ইসলামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী কিছু ছোট দলকে। অথচ কমিশন দাবি করছে, এই দলগুলোর সমন্বয়ই “জাতীয় ঐকমত্য”। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো প্রকৃত ঐকমত্য নয়; বরং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ভিত্তিকে পাশ কাটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা।

অর্থাৎ, এটি গণতান্ত্রিক সংস্কার নয়—বরং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে দুর্বল করে ইসলামপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতার ভারসাম্য হস্তান্তরের প্রচেষ্টা। এমনকি আলোচনায় অংশ নেওয়া কিছু ছোট বাম দলও বলছে, এই প্রক্রিয়া আসলে “অন্তর্ভুক্তির নামে বর্জন।”

বাম দলগুলোর আপত্তি ও সংবিধানিক প্রশ্ন

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, ঐকমত্য কমিশনর এই উদ্যোগ একটি “পরিকল্পিত সংলাপ”, যার উদ্দেশ্য আগে থেকেই নির্ধারিত। তার ভাষায়, “যেখানে দ্বিমতের জায়গাকে জোর করে ঐকমত্য হিসেবে দেখানো হয়, সেখানে গণতন্ত্রই হারিয়ে যায়।”

তিনি সতর্ক করেন, বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় যা সম্ভব, কেবল তাই করা উচিত; সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো বড় সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাচিত সংসদই নিতে পারে। রুহিন প্রিন্স আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ সংবিধানবিরোধী এবং এটি “অনির্বাচিত সরকারের হাতে সংসদের সার্বভৌমত্বকে জনগণের নামে লঙ্ঘনের প্রচেষ্টা।”

সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও তার সঙ্গে একমত। তারা বলেন, বাংলাদেশে গণভোটের ধারা ইতিমধ্যেই বাতিল হয়েছে; তা পুনরায় চালু করতে হলে সংসদীয় অনুমোদন প্রয়োজন। সুতরাং কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণভোট আয়োজন করা সম্পূর্ণ বেআইনি হবে।

বিএনপি–জামায়াতের গণভোট তৎপরতা

সংবিধানবিদদের সতর্কতার পরও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি এই গণভোটের দাবিতে সরব।

রবিবারের বৈঠকের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, “সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। সব দলই মূলত নীতিগতভাবে গণভোটের পক্ষে একমত।” তিনি প্রস্তাব দেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে—যা সংবিধান বিশেষজ্ঞরা সরাসরি অগ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামির সহকারী মহাসচিব হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেন, গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই হওয়া উচিত, যাতে “জাতির ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হয়।” তার প্রস্তাব, নভেম্বর বা ডিসেম্বরে নির্বাচন ঘোষণার আগে গণভোট আয়োজন করা যায়। তিনি বলেন, “ফলাফল আমাদের বিপক্ষে গেলেও আমরা মেনে নেব।”

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের স্থায়িত্বকে বৈধতা দেওয়ার এক কৌশল, যা সংবিধান ও গণতন্ত্রের মৌল নীতির পরিপন্থী।

সংখ্যাগরিষ্ঠের বাইরে গড়ে ওঠা কৃত্রিম ঐকমত্য

যে কমিশন দেশের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব নিয়েছে, তার গঠনই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যেসব দল গত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়েছিল, তাদের বাদ দিয়ে ছোট, অনির্বাচিত ও ধর্মীয় দলগুলোকে আলোচনার কেন্দ্র করা হয়েছে।

বিএনপি চায় নির্বাচনের পর সনদ বৈধতা পাক, জামায়াত চায় নির্বাচনের আগেই তা কার্যকর হোক, আর সিপিবি বলছে—পুরো প্রক্রিয়াটিই অবৈধ। তবুও কমিশন দাবি করছে, তারা জনগণের ‘সম্মিলিত মতামত’ প্রতিফলিত করছে।

নির্যাতনের ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে না পারা একজন সাংবিধান বিশেষজ্ঞের ভাষায়, “যে আলোচনায় আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো নেই, সেটি কোনো জাতীয় ঐকমত্য নয়; বরং একটি সুবিধাবাদী জোট।”

অবৈধ পথে এগোনোর আশঙ্কা

জুলাই সনদকে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তাবে আইনজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ, যা একসময় গণভোটের অনুমতি দিত, বহু আগেই বাতিল হয়েছে। নতুন করে তা ফিরিয়ে আনতে হলে সংসদীয় প্রক্রিয়া জরুরি। কোনো অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার আইনত সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদের বাইরে থেকে কোনো সাংবিধানিক দলিল চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী। একাধিক সংবিধানবিদ বলেছেন, “এটি মূলত অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত এক সাংবিধানিক কসরত, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর উদাহরণ।”

প্রজাতন্ত্রের আত্মার লড়াই

আজকের বিতর্ক আর শুধু প্রক্রিয়া বা প্রস্তাবের সীমায় নেই; এটি বাংলাদেশের মূল পরিচয়ের প্রশ্নে এসে ঠেকেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র এখন তার ভিত্তিমূলেই চ্যালেঞ্জের মুখে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে বাদ দিয়ে ইসলামপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক সংস্কারের যে উদ্যোগ চলছে, তা আসলে দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্লিখন। “গণভোট” নামের এক সংবিধানবিরোধী পথে সেই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাই এখন সর্বোচ্চ উদ্বেগের বিষয়।

১৫ অক্টোবরের সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে। দেশের রাজনৈতিক মহলে এখন একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
সংবিধানের বাইরে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রণীত একটি সনদ কি সত্যিই বাংলাদেশের জনগণের নামে কথা বলতে পারে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

Bitcoin Falls Nearly 2% as Renewed US-Iran Tensions Weigh on Crypto Market

Bitcoin fell nearly 2% to drop below $62,800 as intensifying geopolitical tensions between the United States and Iran dampened investor appetite for digital assets.

More Than 10,000 Die Across Europe as Extreme Heatwave Sweeps Continent

A deadly June heatwave claimed over 10,000 lives across Europe, primarily impacting those aged 65 and above, as Copernicus confirms record-shattering regional temperatures.

Trump Reimposes Naval Blockade on Iran, Seeks 20% Fee for Hormuz Protection

US President Donald Trump announced a naval blockade on Iran and a 20% security fee on transit cargo through the Strait of Hormuz, escalating tensions after recent military clashes.

Up to 1.6 Million Migrants Could Qualify for Faster UK Settlement After Policy Reversal

The UK is preparing to scrap a proposal extending the ILR wait to 10 years for post-Brexit migrants, keeping the 5-year permanent residency route for 1.6 million people.