টানা দুই মাসে রপ্তানিতে পতন, সেপ্টেম্বরে আয় কমেছে ৫ শতাংশ

Date:

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো আয়ে পতন ঘটেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। টানা দুই মাস ধরে এই নিম্নমুখী প্রবণতা রপ্তানি খাতের জন্য এক অস্বস্তিকর সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেপ্টেম্বরের চিত্র

গত সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করে আয় করেছে প্রায় ৩৬৩ কোটি মার্কিন ডলার, যেখানে গত বছরের একই মাসে আয় হয়েছিল ৩৮০ কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে আয় কমেছে প্রায় ১৭ কোটি ডলার।

রপ্তানির এই পতনের মূল কারণ তৈরি পোশাক খাতে আয় হ্রাস। ইপিবি জানায়, তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৬ শতাংশের মতো কমেছে। এ খাত থেকেই এসেছে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩০১ কোটি ডলার, যা এবছর কমে দাঁড়িয়েছে ২৮৪ কোটি ডলারে।

প্রথম প্রান্তিকে মিশ্র ফল

তবে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সামগ্রিক চিত্র কিছুটা ইতিবাচক। এই সময়ে মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। এর মূল কারণ, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয় বেড়েছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। কিন্তু আগস্টে কমে যায় ৩ শতাংশের মতো, আর সেপ্টেম্বরে আবারও হোঁচট খায় পুরো রপ্তানি খাত।

কেন কমছে রপ্তানি

বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি আয়ে এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, পোশাক খাতের দুর্বলতা—বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, অর্ডার হ্রাস ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এই খাতকে বিপাকে ফেলেছে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মুদ্রাস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে সংকোচ বোধ করছেন।

তৃতীয়ত, লজিস্টিকস ও নীতিগত জটিলতা। কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, ডলার সংকট, এবং নীতির অস্থিতিশীলতা ব্যবসায়ীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে জট, রপ্তানি পণ্য পরিবহনে খরচ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতের গতি শ্লথ হচ্ছে।

ঝুঁকির ইঙ্গিত

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এভাবে রপ্তানি আয় কমতে থাকলে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে, কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে, এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—এখন অর্ডার কমে যাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে। অনেক কারখানায় কাজের সময় কমে যাচ্ছে, নতুন নিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে।

করণীয়

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখনই রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। শুধু পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষিজ পণ্য রপ্তানিতে নজর দিতে হবে।

পাশাপাশি, বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন দক্ষতা, গুণগত মান ও ব্র্যান্ড উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারকেও রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা, ঋণ সুবিধা এবং দ্রুত কাস্টমস প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি এখন এক সন্ধিক্ষণে—যেখানে সাময়িক সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, পানিবন্দী ১০ লক্ষাধিক, অবহেলায় বিপন্ন মানুষ

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সাত জেলার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকট।

সহিংসতা ও মানবাধিকার সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

এইচআরএসএসের জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধস, নিহত ৯

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে টানা বর্ষণে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে, আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে আইন শিক্ষার্থীর মৃত্যু: পুলিশের বর্ণনায় মিলছে না নানা তথ্য

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী আইন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুকে ঘিরে ডিবির দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি মিলেছে। মারধর ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ এনেছে নিহতের পরিবার।