জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের আবেদন: ‘‘আমাদের হত্যাযজ্ঞ থামান’’

Date:

দীর্ঘ দশকের নিপীড়ন, বাস্তুচ্যুতি আর গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা মুসলমানরা প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সরাসরি বিশ্বনেতাদের কাছে আবেদন জানালেন।

তাদের আহ্বান ছিল একটাই—মিয়ানমারে চলমান হত্যাযজ্ঞ থামাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

‘‘নির্যাতনের চক্র থামান’’

নারী অধিকারকর্মী ও উইমেন’স পিস নেটওয়ার্ক–মিয়ানমারের নির্বাহী পরিচালক ওয়াই ওয়াই নু তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘আজকের দিনটি মিয়ানমারের জন্য ঐতিহাসিক হলেও অনেক দেরিতে এ আয়োজন হলো। রোহিঙ্গারা বহু বছর ধরে নিপীড়ন, বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার শিকার হলেও কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ নির্যাতনের চক্র আজই থামাতে হবে।’’

মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সমাজ রোহিঙ্গাদের এখনো ‘‘বাংলাদেশি বাঙালি’’ বলে আখ্যা দেয়, যদিও তাদের পরিবার শত শত বছর ধরে রাখাইনে বসবাস করছে। ১৯৮২ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ায় তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছে।

২০১৭ সালের গণহত্যা ও গণপ্রবাহ

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনের হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী বর্বর অভিযানে নামে। আগুনে পোড়ানো হয় গ্রাম, সংঘটিত হয় নারী নির্যাতন, হত্যা ও গণধর্ষণ। মাত্র কয়েক মাসে প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক মহল ও জাতিসংঘ একে ‘‘জাতিগত নিধন’’ এবং ‘‘গণহত্যা’’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

২০২১ সালে অং সান সু চির সরকার উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। রাখাইনসহ বহু এলাকায় রোহিঙ্গারা এখনো শিবিরে বন্দি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা চলাফেরার অধিকার থেকে বঞ্চিত।

শরণার্থীর ভার বহন করছে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। ২০২৪ সালে রাখাইনে মিয়ানমার সেনা ও আরাকান আর্মির নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

তিনি বলেন, ‘‘তাদের এখনো গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের জীবন ভয় ও বৈষম্যের মধ্যে কাটছে।’’

রাজনৈতিক সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই

জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘কোনো যুদ্ধবিরতি নেই, নেই রাজনৈতিক সমাধানের পথ। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে না, কারণ রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকারই নেই।’’

জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান ফলকার টার্ক সতর্ক করে বলেন, ডিসেম্বরের নির্ধারিত নির্বাচন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে হবে এবং তা মিয়ানমারে টেকসই শান্তির কোনো ভিত্তি গড়তে পারবে না।

‘‘নিজ ভূমিতে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চাই’’

আরাকান ইয়ুথ পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা রফিক হোসেন সাধারণ পরিষদে বলেন, ‘‘দশকের পর দশক নিপীড়িত হলেও আমাদের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা নিজের ভূমিতে শান্তিতে বসবাস করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা ও চাপ ছাড়া তা সম্ভব নয়।’’ তিনি রাখাইনে জাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে নিরাপদ অঞ্চল তৈরির আহ্বান জানান।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা স্টুডেন্ট নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা মাওং সায়েদ্দোল্লাহ জোর দিয়ে বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। জাতিসংঘকে রোহিঙ্গাদের ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে।’’

‘‘এখনই পদক্ষেপের সময়’’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আন্নালেনা বেয়ারবক বৈঠকের শেষ বক্তব্যে বলেন, ‘‘আজকের বৈঠক কেবল শুরু। এখন আমাদের আরও কাজ করতে হবে।’’ তিনি আশ্বাস দেন, জাতিসংঘ এ ইস্যুতে কার্যকর অনুসরণমূলক পদক্ষেপ নেবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Share post:

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, পানিবন্দী ১০ লক্ষাধিক, অবহেলায় বিপন্ন মানুষ

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সাত জেলার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকট।

সহিংসতা ও মানবাধিকার সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

এইচআরএসএসের জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধস, নিহত ৯

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে টানা বর্ষণে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে, আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে আইন শিক্ষার্থীর মৃত্যু: পুলিশের বর্ণনায় মিলছে না নানা তথ্য

ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী আইন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুকে ঘিরে ডিবির দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি মিলেছে। মারধর ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ এনেছে নিহতের পরিবার।